২০১২-র ১৬ ডিসেম্বরের রাতে দিল্লিতে চলন্ত বাসে গণধর্ষণের শিকার হন প্যারামেডিক্যালের ছাত্রী নির্ভয়া।এক নাবালক সহ ৬ জন মিলে নারকীয় অত্যাচার চালায় নির্ভয়ার উপর।অত্যাচারের ভয়াবহতায় শিউরে ওঠে সারা দেশ।দোষীদের শাস্তির দাবিতে সরব হয় গোটা দোষ।প্রতিবাদে রাজধানী সহ অন্যান্য শহরে রাস্তায় নামে সাধারণ মানুষ।২০১২-র ডিসেম্বর থেকে ২০২০-র মার্চ মাস, অপরাধের ৭ বছর ৩ মাস পর ফাঁসি হল গণধর্ষণকাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত ৪ জনের।অভিযুক্ত বাসচালক রাম সিংহ জেলের ভিতর আগেই আত্মঘাতী হয়েছে।অভিযুক্ত নাবালক ৩ বছর সংশোধনাগারে থাকার পর মুক্তি পেয়েছে।অবশেষে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের টানাপোড়েনের পর ২০ মার্চ ভোর সাড়ে ৫টায় দিল্লির তিহাড় জেলে ফাঁসি হয়েছে দোষী সাব্যস্ত পবন গুপ্তা, অক্ষয় ঠাকুর, বিনয় শর্মা ও মুকেশ সিংয়ের।
দোষীদের বাঁচার আইনি লড়াইয়ের শেষ রাস্তাটুকু বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বৃহস্পতিবারই চূড়ান্ত হয় যে শুক্রবার কাকভোরে ফাঁসি দেওয়া হবে ৪ জনকে।তবে মধ্যরাতেও একপ্রস্থ আইনি লড়াই চলে। প্রাণভিক্ষার আবেদন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে দ্বারস্থ হয় ৪ দোষী।রাত আড়াইটেয় আদালত বসে।চলে শুনানি।কিন্তু দীর্ঘ শুনানির পর দোষীদের প্রাণভিক্ষার আবেদন খারিজ করে দেয় বিচারপতি আর ভানুমতী, বিচারপতি অশোক ভূষণ ও বিচারপতি এএস বোপান্নার বেঞ্চ।
আসলে রাষ্ট্রপতির খারিজ করে দেওয়া প্রাণভিক্ষার আবেদনের উপর শীর্ষ আদালতের বিচারের এক্তিয়ার সীমিত।আগেই ফাঁসি চূড়ান্ত হয়েছে।একই প্রসঙ্গ বার বার আদালতের কাছে উত্থাপন করা যায় না।মূলত এই মর্মে দোষীদের প্রাণভিক্ষার শেষ আবেদন খারিজ করে দেয় ৩ বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ।এরপরই পূর্ব নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ভোর সাড়ে ৫টায় ফাঁসির সিদ্ধান্ত বলবৎ থাকে।সেইমতো ভোর সোয়া ৫টায় ৪ দোষীকে ফাঁসির জন্য নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।তারপর তাদের শারীরিক পরীক্ষা করা হয়।তারপর ভোর সাড়ে ৫টায় দিল্লির তিহাড় জেলে ফাঁসি দেওয়া হয় ৪ দোষীদেরকে।নির্দিষ্ট সময় পর তিহাড় জেলের ডিরেক্টর সন্দীপ গোয়েল ৪ জনকেই মৃত বলে ঘোষণা করেন।
এই ঘটনাকে বলা হচ্ছে রেয়ারেস্ট অফ দ্য রেয়ার ক্রাইম।অর্থাত্ বিরলতম অপরাধের মধ্যেও বিরল। এমন নৃশংস গণধর্ষণ ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল নির্ভয়ার শরীর।দোষী ৬,তার মধ্যে একজন নাবালক হওয়ায় ছাড়া পেয়ে যায় দ্রুত।বাকি পাঁচ জনকে নিয়ে চলতে থাকে টানাপোড়েন।২০১৩ সালে তিহাড় জেলেই মৃত্যু হয় এক রাম সিং-এর।আত্মহত্যা করে সে।সপ্রিম কোর্ট বাকিদের মৃত্যুদণ্ড দিলেও চলে দীর্ঘ টালবাহানা। কিন্তু হাল ছাড়েননি নির্ভয়ার মা-বাবা। মেয়ের হয়ে লড়াইটা চালিয়ে গিয়েছিলেন। অতঃপর ২০ মার্চ, ২০২০।
২০১২ সালের শীতের দিল্লি,১৬ ডিসেম্বর রাজধানীর রাজপথে চলন্ত বাসে বন্ধুর সামনেই ৬ জন মিলে নৃশংসভাবে ধর্ষণ করে প্যারামেডিকাল ছাত্রী নির্ভয়াকে।ধর্ষণের পর চলন্ত বাস থেকে ফেলে দেওয়া হয় তাঁকে।এই ঘটনায় তোলপাড় হয়ে গিয়েছিল গোটা দেশ।২৩ বছরের নির্ভয়া মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে জিততে পারেননি,কিন্তু সাত বছর পর অবশেষে সুবিচার পেয়েছেন তিনি।মেয়ের হয়ে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন নির্ভয়ার মা-বাবা।পাশে পেয়েছেন দেশের মানুষের নিঃশর্ত সমর্থন।সাত বছরের দড়ি টানাটানি এবং শেষ মুহূর্তের নানা নাটকীয় মোড়ের পর অবশেষে শুক্রবার ২০ মার্চ, ২০২০ ভোর সাড়ে পাঁচটায় একসঙ্গে নির্ভয়ার চার খুনিকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয় তিহাড় জেলে।
ঘটনা এবং তদন্তে জানা গিয়েছে দক্ষিণ দিল্লির আর কে পুরম অঞ্চলে এক বস্তির বাসিন্দা ছিল এই ছয় খুনি,বলা যায় পড়শি।যে বাসে ধর্ষণ করা হয় নির্ভয়াকে সেই বাসের ক্লিনারের কাজ করত মুকেশ।সেই রাতে লোহার রড দিয়ে নির্ভয়া ও তাঁর বন্ধুকে বেধড়ক পেটায় মুকেশ। বিবিসি-র তথ্যচিত্রে মুকেশ জানিয়েছিল রাতে যে সব মেয়ে বাড়ির বাইরে থাকে তাঁদের সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটাই স্বাভাবিক।এর জন্যে অন্য কেউ নয়, একমাত্র সেই সব মেয়েরাই দোষী।সঙ্গী বিহারের ঔরঙ্গাবাদ জেলার স্কুল পালানো অক্ষয় ঠাকুর বিবাহিত এবং এক পুত্র সন্তানও আছে।তারই স্ত্রী কিছুদিন আগে অক্ষয়ের থেকে বিবাহবিচ্ছেদ চেয়ে আবেদন করেছিল।ধর্ষকের স্ত্রী হয়ে বাঁচার অপমান মেনে নিতে পারবে না বলেই জানিয়েছিলেন তিনি।আরেকজন,পেশায় জিম প্রশিক্ষক বিনয় সেই সময় বাসটি চালাচ্ছিল যখন নাবালক সহ বাকি চার জন নির্ভয়াকে ধর্ষণ করছিল।এরপর বাসের স্টিয়ারিং মুকেশের হাতে দিয়ে সেও নির্ভয়াকে ধর্ষণ করে।একমাত্র বিনয়ই স্কুলের পড়া শেষ করেছিল এবং ইংরেজিও বলতে পারত।এদের সঙ্গী,পেশায় ফল বিক্রেতা পবনও নির্ভয়াকে ধর্ষন করেছিল এবং তাঁর বন্ধুকে পিটিয়েছিল।চার খুনির মধ্যে কনিষ্ঠ পবন তিহাড় জেল থেকেই স্নাতক হয়।
এখানেই শেষ নয় ,মুকেশের বড় ভাই রাম সিং ছিল বাসের চালক।পাক্কা ক্রিমিনাল রাম সিং আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিনে পর দিন নানা অপরাধ করে গিয়েছে।নির্ভয়ার যৌনাঙ্গে লোহার রড ঢুকিয়ে অন্ত্র বের করে আনে।১৭ ডিসেম্বর, ২০১২ সালে পুলিশের হাতে প্রথম ধরা পড়ে,রাম সিং। ২০১৩ সালে তিহাড় জেলের ভিতরেই তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়।আর,এক নাবালক ,অপরাধের সময় কয়েক দিনের জন্যে প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়ায় পূর্ণাঙ্গ সাজা পায়নি সে।জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী তিন বছর সংশোধনাগারে রেখে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।মাত্র ১১ বছর বয়সে দিল্লি থেকে ২৪০ কিমি দূরের গ্রাম থেকে পালিয়ে শহরে চলে আসে ওই নাবালক। তার পরিবার এখনও সেই গ্রামেই থাকে।
Share
