সেই রাতেই নিহত হন বঙ্গবন্ধুর বোনের স্বামী আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছেলে আরিফ, মেয়ে বেবী ও শিশুপৌত্র সুকান্ত বাবু; বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মণি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি, নিকট আত্মীয় শহীদ সেরনিয়াবাত ও রিন্টু।
ধানমণ্ডির বাড়িতে পুলিশের বিশেষ শাখার সাব ইন্সপেক্টর সিদ্দিকুর রহমান ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল জামিলকেও গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়।
বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশের বাইরে থাকায় সে সময় প্রাণে বেঁচে যান। বঙ্গবন্ধুকে জন্মস্থান গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় দাফন করা হলেও পরিবারের অন্য সদস্যদের ঢাকার বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়।
ঢাকা থেকে আমাদের সংবাদদাতা আলী হাবিব জানান, যথাযথ মর্যাদা এবং ভাবগাম্ভীর্যের সাথে গতকাল ১৫ই অগাস্ট বাংলাদেশে জাতীয় শোক দিবস পালিত হয়েছে।
জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত মিলাদ ও দোয়া মাহফিলে যোগ দেন।
৪৪ বছর আগে ঘটে যাওয়া এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য শহীদের আত্মার শান্তি কামনায় বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগ রাজধানীর ধানমন্ডিতে ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের সামনে গতকাল বাদ আসর এই মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে।
এছাড়াও বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বাংলাদশে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনগুলো এই দবিসটি পালন করে।
এদিকে ক্যানবরোতে গতকাল বাংলাদেশ হাইকমিশন জাতীয় শোক দিবস ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানরে ৪৪তম শাহাদত বার্ষিকী যথাযথ মর্যাদা ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে পালন এবং এই প্রথমবারের মতো হাইকমিশন চত্ত্বরে বঙ্গবন্ধু কর্নার উদ্বোধন করা হয়।

হাইকমিশনের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সন্ধ্যা ৭ টায় জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদনের জন্য বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুস্প স্তবক অর্পণ করেন হাইকমিশনার, হাইকমিশনের অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণ ও অন্যান্য উপস্থিত সুধীজন। এরপরই হাইকমিশন চত্ত্বরে প্রথমবারের মত বঙ্গবন্ধু কর্নার উদ্বোধন করা হয়। বঙ্গবন্ধু কর্নারে বঙ্গবন্ধুর গুরুত্বপূর্ণ ছবি, তাঁর জীবন ও কর্ম এবং মুক্তিযুদ্ধের উপর রচিত বিভিন্ন বই ও সিডি প্রদর্শন করা হয়েছে। এছাড়াও বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য, বিভিন্ন সংস্কৃতি এবং প্রগতিশীল ও অগ্রসরমান বাংলাদেশের বিভিন্ন বই এই কর্নারে রাখা হয়েছে।
শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতের সংগ্রামের যে নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধু দিয়েছিলেন তারই আদর্শ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া এবং অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ফিজিতে বসবাসরত প্রবাসী তরুণ প্রজন্মকে সোনার বাংলা বির্নিমাণে উদ্বুদ্ধ করা বঙ্গবন্ধু কর্নারের মূল উদ্দেশ্য। একই সাথে বিদেশি গণ্যমান্য ব্যক্তি যারা বাংলাদেশ হাইকমিশন, ক্যানবেরা পরিদর্শ করবেন তাদের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুকে ব্যাপকভাবে জানার সুযোগ সৃষ্টি করবে।
সন্ধ্যাকালীন কর্মসূচিতে স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন দ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কর্মময় জীবনের উপর আলোচনা অনুষ্ঠানে হাইকমিশনারসহ অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিরা অংশগ্রহণ করেন। আলোচনা অনুষ্ঠানে হাইকমিশনার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ১৫ আগস্টে নিহত সকল শহীদের প্রতি শোকাহত চিত্তে গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। তিনি তাঁর বক্তবে বঙ্গবন্ধুর বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ইতিহাস ব্যাখ্যা করে বলেন যে, বঙ্গবন্ধু তাঁর নাতিদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ভাষা, ধর্ম ও স্বাধিকার বিষয়গুলো একসূত্রে গেঁথে একপ্রকারে বাঙালির জাতিস্বত্ত্বাকে সংজ্ঞায়িত করেন। তিনি জাতির পিতার আদর্শ ও দর্শনের কতিপয় মাত্রার উপর আলোকপাত করেন। তিনি তাঁর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ গঠন ও ক্ষুদা-দারিদ্রমুক্ত, সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গঠনের আন্তরিক প্রয়াসে সবাইকে সর্বাত্মক অংশগ্রহণের জন্য আহবান জানান।

অন্যান্য আলোচকগণ বঙ্গবন্ধুকে কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করেন এবং তার কিংবদন্তী নেতৃত্ব ও অবদান নিয়ে আলোচনা করেন। তারা তাঁর প্রজ্ঞা এবং আপোষহীন নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। তারা বলেন ঘাতক চক্র বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেও তাঁর স্বপ্ন ও আদর্শের মৃত্যু ঘটাতে পারেনি। তাঁরা শোককে শক্তিতে পরিণত করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার জন্য কাজ করে যাবেন মর্মে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
পরিশেষে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের শহীদ সদস্যদের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষনা করেন।
এরপূর্বে ক্যানবেরায় সূর্যোদয়ের প্রাক্কালে হাইকমিশন চত্ত্বরে হাইকমিশনার সুফিউর রহমান কর্তৃক জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করণের মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু করা হয়। এরপরে জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষ্যে মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও মাননীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী প্রদত্ত বাণী পাঠ করা হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের সকল শহীদ সদস্যের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া ও মোনাজাতের মধ্য দিয়ে দিনের প্রথম ভাগের কর্মসূচি শেষ হয়।
