মূল বিষয়:
- লুনার নিউ ইয়ার উদযাপনের সময় সাধারণত লাল রঙ এবং আতশবাজি ব্যবহৃত হয়
- তবে চান্দ্র বর্ষ উদযাপন করা সকলেই লাল রঙকে সৌভাগ্য এবং প্রতিরক্ষার প্রতীক হিসাবে বিবেচনা করে না
- ভিয়েতনামের মানুষেরা খরগোশের পরিবর্তে বিড়ালের বছর হিসেবে চান্দ্র বর্ষ উদযাপন করে
লুনার নিউ ইয়ার হল বিগত বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর সময়। সাধারণত পরিবারের সকলে একত্রিত হয়ে এটি উদযাপন করে থাকে। একই সাথে এটি উত্তর গোলার্ধে বসন্তের আগমন উদযাপন করার সময়। যে-কারণে এটি ‘বসন্ত উৎসব’ নামেও পরিচিত।
এবং যদিও বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ একই দিনে নতুন বছর শুরু করে, তবে সারা বিশ্বের মানুষ নিজেদের স্বতন্ত্র ঐতিহ্য অনুযায়ী বেশ আলাদা রকমে এই অনুষ্ঠানটিকে উদযাপন করে থাকে।
আপনার ভাষায় এবং ইংরেজিতে আরও প্রতিবেদনের জন্যে ভিজিট করুন Lunar New Year webpage.
অশুভ আত্মাকে ভয় দেখিয়ে বিদায় জানানো
চীনারা এই উৎসবে লাল রঙের সজ্জা ব্যবহার করে এবং লাল কাগজে অভিবাদন বাক্য লিখে থাকে যার নাম ফাই চুন (揮春)। তারা আতশবাজি জ্বালিয়ে ড্রাগন এবং সিংহ নাচ পরিবেশন করে এবং গং ও ড্রাম বাজিয়ে অশুভ আত্মা, বিশেষত পশু নিয়ানকে (Nian) তাড়িয়ে দেয়।
চীনা পৌরাণিক কাহিনীতে রয়েছে যে নিয়ান নতুন বছরের শুরুতে তার লুকানো জায়গা থেকে বেরিয়ে আসে, মানুষ এবং প্রাণীদের খেয়ে ফেলার জন্য। কথিত আছে যে নিয়ান প্রচণ্ড আওয়াজ ও আগুন দেখলে ভয় পায় এবং লাল রঙ দেখলে পালিয়ে যায়।
চীনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকেরা ঐতিহ্যবাহী খাবার খেয়ে নতুন বছর উদযাপন করে। উত্তর চীনে এই দিনে পরিবারের সকলে একত্রিত হয়ে ডাম্পলিং খায়, অন্যদিকে দক্ষিণ চীনের লোকেরা খায় রাইস কেক, ডিপ ফ্রাইড ডাম্পলিং, এবং মিষ্টি ও পদ্মবীজের (lotus seed) মত হালকা খাবার।

চীনা পরিবারগুলি নতুন বছরের প্রাক্কালে সমবেত হয় এবং গত বছরের সৌভাগ্যের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে নৈশভোজ উপভোগ করে। দক্ষিণ চীনে নৈশভোজের খাবার-তালিকায় থাকে মুরগি, মাছ এবং অন্যান্য মাংস। আর উত্তর অঞ্চলে রাতের খাবারের তালিকায় রয়েছে ডাম্পলিং এবং হট পটে রান্না করা খাবার।
তাইওয়ানের মানুষের জন্যে ঐতিহ্যবাহী খাবার হচ্ছে আদা দিয়ে হাঁসের স্টু এবং ওয়াইন দিয়ে রান্না করা মুরগির স্যুপ, যা পুনর্মিলনের প্রতীক। তাদের নববর্ষের অন্যান্য রীতিনীতির মধ্যে রয়েছে অসংখ্য ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক শিষ্টাচার।
লুনার নিউ ইয়ার উদযাপনের সময় চীনারা পৌরাণিক কাহিনীতে বর্ণিত নিয়ানকে উদ্দেশ্য করে লাল বা অন্যান্য উজ্জ্বল রঙের পোশাক পরেন। আবার কেউ কেউ নতুন বছরকে নতুন ভাবে শুরু করে স্বাগত জানানোর প্রতীক হিসেবে আগাগোড়া নতুন জামা কাপড় পরে থাকেন।
বয়োজেষ্ঠ্যরা লাল প্যাকেট বা লাকি মানি (লাই সি; 利是) নামে পরিচিত লাল খামে করে তাঁদের নতুন প্রজন্মকে অর্থ উপহার দেন। বিনিময়ে তরুণ প্রজন্ম ঐতিহ্যগত শিষ্টাচার এবং রীতিনীতি অনুযায়ী তাদের প্রবীণদের সুখ, সুস্বাস্থ্য এবং সৌভাগ্য কামনা করে।

তবে সকলেই লাল রঙ ব্যবহার করে না
কোরিয়ানদের দ্বারা লুনার নিউ ইয়ার উদযাপনের সন্ধান পাওয়া যায় সপ্তম শতাব্দীর চীনা ঐতিহাসিক সাহিত্য ‘বুক অফ সুই’ এবং ‘দ্য ওল্ড বুক অব ট্যাঙ’-এ। আর কোরিয়ানদের নিজস্ব ইতিহাসে প্রথম চান্দ্র বর্ষ উদযাপন দেখা যায় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে লিখিত ‘মেমোরাবিলিয়া অব দ্য থ্রি কিংডমস’ বইয়ে, যেখানে লুনার নিউ ইয়ার বছরের উল্লেখযোগ্য কোরিয়ান ঐতিহ্যবাহী নয়টি উৎসবের মধ্যে একটি হিসাবে বিবেচিত হয়েছিল।
লুনার নিউ ইয়ার উদযাপনকারী অন্য অনেক জাতির মত লাল রঙটি কোরিয়ান সংস্কৃতিতে একই তাৎপর্য ধারণ করে না এবং মন্দ আত্মাকে দূরে রাখতে বা সৌভাগ্য আনতে সক্ষম বলে মনে করা হয় না। সুতরাং, কোরিয়ায় নতুন বছর উদযাপনকারী লোকেরা সব ধরণের এবং রঙের পোশাক পরে।

লুনার নিউ ইয়ারের প্রথম দিনে, যাকে সিওলাল (Seollal, 설날) বলা হয়, লোকেরা কথা এবং কাজ উভয়ক্ষেত্রেই সতর্ক থাকে এবং দুর্ভাগ্য এড়ানোর জন্য ঐতিহ্যবাহী কোরিয়ান হ্যানবক (Hanbok, 한복) পরিধান করে। এ দিনে তারা প্রথা অনুযায়ী পূর্বপুরুষদের স্মরণ ও উপাসনাও করে থাকে।
তরুণ প্রজন্ম পরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে এবং পরিবারের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি থেকে শুরু করে ক্রমান্বয়ে বাকিদেরকে শুভ কামনা জানায় এবং একটি ফলপ্রসূ ও সমৃদ্ধ বছর কামনা করে।
বিনিময়ে শিশুরা একটি খামের মধ্যে করে অর্থ উপহার পায়। খামগুলি যে কোনও রঙের হতে পারে কারণ কোরিয়ানরা লাল রঙকে সৌভাগ্যের চিহ্ন বলে মনে করে না।

Tteokguk (떡국), বা স্লাইস করা রাইস কেকের স্যুপ, একটি ঐতিহ্যবাহী কোরিয়ান খাবার যা লুনার নিউ ইয়ার উদযাপনের সময় খাওয়া হয় এবং এই সময়ে এটিকে কোরিয়ানদের জন্য সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বমূলক খাবার হিসাবে বিবেচনা করা হয়।
এতে পাতলা করে কাটা রাইস কেকের সাথে ঝোল থাকে। এই বৃত্তাকার সাদা রাইস কেকের টুকরোগুলি সুস্বাস্থ্য এবং সমৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।

স্লাইসড রাইস কেক স্যুপ ছাড়াও কোরিয়ানরা ইয়াকওয়া (yakgwa, 약과), যেটি মধু, চালের ওয়াইন, তিলের তেল এবং আদার রস দিয়ে তৈরি একটি গমের মিষ্টান্ন, এবং গ্যাংজেয়ং (gangjeong, 강정), যা চালের ময়দা এবং মধু থেকে তৈরি একটি ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন গ্রহণ করে।
অন্যান্য সংস্কৃতির মতো কোরিয়ানরাও নববর্ষের প্রাক্কালে পুনর্মিলনী নৈশভোজের জন্য একটি পরিবার হিসাবে জড়ো হয়। ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলির মধ্যে রয়েছে ওগোক-বাপ (ogok-bap, 오곡밥),পাশাপাশি টিওক (tteok, 떡), যার অর্থ কোরিয়ান রাইস কেক, এবং মান্ডু (만두), যা কোরিয়ান ডাম্পলিং।
২০২৩ সাল খরগোশের নাকি বিড়ালের বছর?
ভিয়েতনামী সংস্কৃতির বারোটি রাশি অনুসারে, ২০২৩ সাল আসলে বিড়ালের বছর, খরগোশের নয়। চান্দ্র নববর্ষের প্রথম দিনটিকে বলা হয় টেট নগুয়েন ড্যান (Tết Nguyên Đán)।
প্রাচীন কিংবদন্তি অনুসারে বলা হয়, রাশিচক্রের ক্রম নির্ধারণের জন্য সমস্ত প্রাণীকে একটি নদীর পাশে এক দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেখানে চালাক ইঁদুরটি বিড়ালকে ঠকিয়ে ছিল, তাই বিড়ালটি দৌড় সমাপ্ত করতে পারেনি।
তবে ভিয়েতনামী কিংবদন্তীতে এটি একটু ভিন্নভাবে উল্লেখ করা আছে। সেখানে বলা, যদিও বিড়ালটি প্রতারিত হয়, তবুও এটি নদীর ওপারে তার পথ খুঁজে পেতে সক্ষম হয়েছিল, এবং খরগোশকে প্রতিস্থাপন করে প্রথম ১২ টি প্রাণীর মধ্যে ঢুকে যায়।
যদিও এই পার্থক্যের পিছনে আসল কারণটি অবশ্য যাচাই করা সম্ভব নয়। একটি তত্ত্ব হচ্ছে, যখন ভিয়েতনামে চীনা রাশিচক্রের সূচনা হয়, তখন এটি কিছুটা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। কারণ ‘খরগোশ’ শব্দটির ভিয়েতনামী উচ্চারণ ‘বিড়াল’ শব্দটির অনুরূপ, আর এভাবেই বিড়াল সেই রাশিচক্রে খরগোশকে প্রতিস্থাপন করে ফেলে।
আরেকটি তত্ত্ব বলে যে, ভিয়েতনামের উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে ইঁদুর হচ্ছে কৃষকদের জন্য একটি গুরুতর সমস্যা। যেহেতু বিড়াল ইঁদুরের শত্রু, তাই ভিয়েতনামী কৃষকরা বিশ্বাস করত যে বিড়ালই সমৃদ্ধ ফসল এবং ভাল আবহাওয়া নিয়ে আসতে পারে এবং তাই তাদের রাশিচক্রে খরগোশকে বাদ দিয়ে বিড়াল নিয়ে আসা হয়।
চীনা এবং কোরিয়ানদের মতোই ভিয়েতনামের লোকেরাও চান্দ্র নববর্ষ উদযাপনের সময় পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে, বিশেষত একটি ‘পাঁচ-ফলের ট্রে’ (Mâm ngũ quả) দিয়ে। এটিতে সাধারণত কাস্টার্ড আপেল, ডুমুর, নারকেল, বট ফল এবং আম অন্তর্ভুক্ত থাকে, যা সমৃদ্ধি এবং অন্তহীন সৌভাগ্যের প্রতীক।

নববর্ষের শুরুতেই পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার পরে বাড়িতে ফেরার পথে, ভিয়েতনামীরা সবুজ পাতাযুক্ত একটি গাছের ডাল খুঁজে নেয় যা স্বর্গ এবং পৃথিবীর দেবতাদের আশীর্বাদের প্রতীক। পাতা শুকিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত সেই ডালগুলি বাড়িতে রেখে দেয়া হয়। এই রীতিটি হাই লক (Hái lộc) নামে পরিচিত।
রাতে ভিয়েতনামী পরিবারগুলি পুনর্মিলনী নৈশভোজের জন্যও জড়ো হয়।
নববর্ষের প্রথম দিনে সমস্ত পরিবারকে তাদের পূর্বপুরুষদের কাছে কিছু জিনিস উৎসর্গ করতে হয়। পাশাপাশি আর্থ গড বা পৃথিবীর দেবতা, কিচেন গড বা খাদ্যের দেবতা এবং সমস্ত শিল্পের দেবতার উপাসনা করতে হয়। উৎসর্গের মধ্যে সাধারণত অন্তর্ভুক্ত থাকে চালের ডাম্পলিং, ভাজা মাছ, মাংসের ডাম্পলিং, ভাজা মাংস, আচারযুক্ত স্ক্যালিয়ন, গরুর মাংস এবং অন্যান্য খাবার।
এই উৎসর্গের পরে তরুণ প্রজন্ম তাদের প্রবীণদের অভিবাদন জানায়, যারা বিনিময়ে লাল খামে করে তাদেরকে ‘লাকি মানি’ বা অর্থ প্রদান করে।
লুনার নিউ ইয়ারের একটি ঐতিহ্যবাহী ভিয়েতনামী খাবার হল বানহ চং (bánh chưng), কলা পাতায় মোড়ানো একটি চারকোণা চালের কেক, সাধারণত মুগ মটরশুটি এবং শুয়োরের মাংস দিয়ে তৈরি হয়।

প্রথম চান্দ্র মাসের ১৫ তম দিনে, ভিয়েতনামী এবং চীনা জনগণ উভয়ই ফানুস উৎসব (Lantern Festival) উদযাপন করে, পূর্ণিমার চাঁদ উপভোগ করে এবং ফানুসে লেখা বিভিন্ন ধাঁধা সমাধান করে।
এসবিএস বাংলার অনুষ্ঠান শুনুন রেডিওতে, এসবিএস বাংলা রেডিও অ্যাপ-এ এবং আমাদের ওয়েবসাইটে, প্রতি সোম ও শনিবার সন্ধ্যা ৬ টা থেকে ৭ টা পর্যন্ত। রেডিও অনুষ্ঠান পরেও শুনতে পারবেন, ভিজিট করুন: এসবিএস বাংলা।
আমাদেরকে অনুসরণ করুন ফেসবুকে।
