ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার পার্থের স্থানীয় শিল্পীদের নিয়ে গড়ে ওঠা নাট্যদল “বেঙ্গল আর্টসে“র তৃতীয় প্রযোজনা “মাস্টার বাড়ি“।
বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়া এসোসিয়েশনের অফ ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া (বাওয়া) আয়োজিত বাৎসরিক নাট্যোৎসবে এটি ছিল একটি মৌলিক নাটক পরিবেশনা।
মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত এ নাটকের মুখ্য চরিত্র গ্রামের স্কুলের শিক্ষক জগদীশ বাবু।
নাটকটি পরিচালনা করেছেন নাট্যকার বিশ্বজিৎ বসু এবং তার সহযোগিতায় ছিলেন শর্মিষ্ঠা সাহা।
মিসেস শর্মিষ্ঠা সাহা এসবিএস বাংলাকে জানিয়েছেন, প্রায় পয়তাল্লিশজন নিবেদিত প্রাণ নাট্যকর্মীর সাড়ে তিন মাসের নিরলস পরিশ্রমের ফসল এ নাটক।

নাটকটির গল্প গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে একজন শিক্ষকের অবদান নিয়ে, যিনি গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকে নিজ বাড়ির পাশে পতিত জমিতে ঘর তুলে এলাকার শিশু কিশোরদের শিক্ষাদান করতে থাকেন। ধীরে ধীরে তাঁর পরিচয় হয়ে উঠে মাস্টার মশাই আর স্কুলটির পরিচয় হয়ে উঠে মাস্টার বাড়ি স্কুল।
এ নাটকে উঠে এসেছে ১৯৭১ সালে ঘটে যাওয়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মত প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো।
মিসেস সাহা আরো জানান, এই নাটকে আধুনিক মঞ্চের সুবিধা নিয়ে ব্যবহৃত ডিজিটাল ব্যাকড্রপ, ভিডিও ফুটেজ, আলোর মায়াজাল, শব্দের মাদকতা, নাচ-গানের মূর্চ্ছনা এবং অভিনয় শিল্পীদের সাবলীল অভিনয়।
"মুক্তিযুদ্ধকালিন টেনশন, হতাশা, বেদনা, একটি গোষ্ঠীর বিশ্বাসঘাতকতা, দেশপ্রেম, সাধারণ মানুষের জেগে ওঠা এবং বিজয় অর্জন – নাটকের এই নানা বিষয়গুলো নেক্সাস থিয়েটারে উপস্থিত সকল দর্শকদের যেন ফিরে নিয়ে গিয়েছিল ১৯৭১ এর সেই উত্তাল সময়ে।"
তিনি বলেন, "নাটকে যারা অভিনয় করেছেন এবং দর্শকসারিতে যারা বসে ছিলেন তাদের বেশীরভাগই মুক্তিযুদ্ধ দেখেননি। কিন্তু “মাস্টার বাড়ি“র মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে সেদিন সন্ধ্যায় সকলেই পৌছে গিয়েছিলেন সেই সময়ে, বাঙালির গর্বের ইতিহাসের সাক্ষি হতে।"
এই নাটকে একটি দারুণ সংযোজন "জাগো জাগো" গানটি ।
এ প্রসঙ্গে মিসেস সাহা জানান, "নাটকের দৃশ্যে দেখা যায় রাজাকারেরা (বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী) আশপাশের গ্রাম থেকে নারীদের ধরে এনে হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে পাক সেনাদের হাতে তুলে দেয়। স্কুল শিক্ষিকা সেলিনাও বাদ যায় না এদের থেকে। তবে নিজের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সে পাক বাহিনীর অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে আসতে সমর্থ হয়।"
"নির্যাতিত সেলিনার মানসিক শক্তি সঞ্চয়ের মাধ্যমে জেগে ওঠার চিত্র তুলে ধরার জন্য এই গানটি রচিত হয়। "
নাট্যকার বিশ্বজিৎ বসু এ গানটি রচনা করেছেন। নাট্যকারের সুর ভাবনায় গানটির সুর করেছেন এবং কন্ঠ দিয়েছেন তাসনিমুল গালিব অমিত।
বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন অরুণ সাহা, বাপ্পী রায়, সৈয়দ সাজিদ হোসেন, শর্মিষ্ঠা সাহা, বিশ্বজিৎ বসু, আসিফ ইকবাল, বাবলু হীরা মন্ডল, বঙ্কিম শিকারী, অনিনিন্দিতা দে ত্রয়ী, সাদিকুর রহমান, ফারজানা কাঁকন, রবিন বণিক, নূপুর তুলসান, অমিত দত্ত, পলাশ বড়ুয়া, দেবব্রত ব্যানার্জী ও শৌভিক লাহিড়ী।
এছাড়াও নাটকে দশ জন শিশু শিল্পী অভিনয় করেছে। বিস্ময়, আয়ান, দেবর্ষী, মোহিনী, অভিরাজ, রাজর্ষী, শব্দ, অরিকা, নিধি এবং শালিনী। নাটকে ব্যবহৃত দুটি নাচের কোরিওগ্রাফিসহ "জাগো জাগো" গানটির সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করেন জয়তি মাবরুক।
শরনার্থী শিবিরে সঙ্গীতদলের হয়ে “তীর হারা ওই ঢেউয়ের সাগর“ গানটি পরিবেশন করেন নজরুল ইসলাম, আসিফ আল মামুন, গার্গী সরকার, পান্না বড়ুয়া লিজা, শর্মিষ্ঠা তালুকদার, সুবর্ণা চৌধুরী, শীব নারায়ণ সাহা, মনোব্রত সাহা ও অর্জুন সরকার।

মঞ্চ ব্যবস্থাপনায় ছিলেন অয়ন ভট্যাচার্য, শিশির ঘোষ, নাফিসা আক্তার চৌধুরী। মেকআপে ছিলেন ঈশিতা সুলতানা, প্রমপ্টে ছিলেন নুসরাত আক্তার। শব্দ প্রক্ষেপণে ছিলেন ঝুটন কুরী, আলোক সম্পাতে কামরুল আহমেদ। নেপথ্য কন্ঠ দিয়েছেন সঙ্গীতা সাহা এবং শুভাশিস দাস।
দর্শকদের প্রতিক্রিয়া
পার্থে বাংলা নাটকের নিয়মিত দর্শক সৃজীব চক্রবর্তী নাটক শেষে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন “মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক নাটক মাস্টার বাড়িকে সুচারুরূপে সাজিয়ে মঞ্চে প্রদর্শন করা খুব সহজ ছিল না। কিন্তু নাটকের সকল কলাকুশলী দারুণ দক্ষতার সাথে কাজটি সম্পন্ন করেছেন। সব মিলিয়ে মাস্টার বাড়ি এমন একটি নাটক যা মিস্ করা চলে না।“
নাটক দেখতে ভালবাসেন সাইফুল ইসলাম। তার খোলাখুলি অভিব্যক্তি, “দারুণ একটা নাটক দেখলাম। আমাদের খুব ভাল লেগেছে।“
পার্থের বাঙালি সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ ও সংগঠক আরিফ আক্কাস বলেন, “ নাটকের প্লটটা খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল। সবাই তাদের নিজ নিজ চরিত্রে খুব ভাল করেছে।“
বাংলার বাইরে জন্ম ও বেড়ে ওঠা শ্যামানন্দিনী দাসীর স্বামী বাঙালি। তিনি স্বামীর কাছে তার ছোটবেলার স্মৃতির পাতা থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কথা শুনেছেন। মাস্টার বাড়ি নাটক দেখে তিনি ভীষণভাবে আপ্লুত। নাটক দেখতে দেখতে তার মনে হয়েছে মাঝে মাঝেই তিনি নেক্সাস থিয়েটার থেকে সড়ে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধকালিন সময়ের উত্তেজনায় ডুবে যাচ্ছিলেন। কোন কোন দৃশ্যের অভিনয় তার চোখে জল নিয়ে এসেছে।
এসবিএস বাংলার অনুষ্ঠান শুনুন রেডিওতে, এসবিএস বাংলা অডিও অ্যাপ-এ এবং আমাদের ওয়েবসাইটে, প্রতি সোম ও শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৭টা পর্যন্ত।
রেডিও অনুষ্ঠান পরেও শুনতে পারবেন, ভিজিট করুন: এসবিএস বাংলা।
আমাদেরকে অনুসরণ করুন ফেসবুকে।
