নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের লাকেম্বা সাবার্বের রেলওয়ে প্যারেড যেন এক টুকরো বাংলাদেশ। যাকে অনেকেই 'লিটল বাংলাদেশ' নামেও ডাকেন। এর অন্যতম কারণ বাংলাদেশী পণ্য এবং খাবারের অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি।
২০১৪ সাল থেকে এখানেই মাংসের ব্যবসা করছেন প্রবাসী উদ্যোক্তা জামাল হোসেইন। নিজের পূর্ব অভিজ্ঞতাকে সম্বল করে একজন কর্মী নিয়ে শুরু করেন ব্যবসা। আজ তার কর্মী সংখ্যা ৭ জন।
"চাকরির পাশাপাশি ব্যবসা করা সম্ভব নয়, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসা। মালিককে অবশ্যই পূর্ণকালীন কাজ করতে হবে," বলেছেন জামাল।
"এখানে আমার যে সঞ্চয় ছিল তা আমি ব্যবসায় বিনিয়োগ করিনি। ব্যবসা শুরুর পর প্রথম ছ'মাস সঞ্চয়ের টাকা দিয়ে পারিবারিক খরচ চালাই। ব্যবসার মূলধন নিয়ে আসি দেশ থেকে।"

আরেক ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শামীম হোসেনের শুরুর গল্পে মিলবে জামালের কথার প্রতিফলন। বহুজাতিক রেষ্টুরেন্ট কোম্পানির ম্যানেজার পদ ছেড়ে মুদি এবং খাবার ব্যবসায় আসেন শামীম। ছিল না কোন অভিজ্ঞতা। ব্যবসা শুরুর পর চাকরিও করেন ক'মাস।
"দিন এনে দিন খাওয়া ব্যাপারটা আমার ভালো লাগতো না। পরিবারের অসম্মতিতেই ম্যানেজার পদ ছেড়ে ব্যবসায় নামি," বলেছেন শামীম।
"ব্যবসার শুরুতে হতাশ হয়ে পড়ি। হতাশা কাটাতে ছ'মাসের মাথায় আরো একটি ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করি। এটা ছিল আমার আরেকটি ভুল। অনেকটা আত্মহত্যার সামিল।"
চাকরি ছেড়ে এবং দ্বিতীয় ব্যবসা বন্ধ করে, দু'বছরের মাথায় নিজেকে গুছিয়ে উঠেন শামীম। তিনি বলেন, "যার যেটায় অভিজ্ঞতা তার সে ব্যবসায় আসা উচিত। পণ্য কেনার সময় জিততে না পারলে ব্যবসা লাভজনক করা কষ্টকর। পাশাপাশি ব্যবসার স্থান এবং কর্মী সংখ্যা নির্ধারণও বড় ব্যাপার।"

তরুণ উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় স্বাগত জানিয়ে ভিন্ন ভিন্ন পরামর্শ দিয়েছেন জামাল এবং শামীম।
"ক্ষুদ্র ব্যবসায় অংশীদার (পার্টনার) নেয়া ঠিক না। শুরুর ক'মাস পারিবারিক সমর্থনটা জরুরী," বলেছেন জামাল।
শামীম বলেন, "ক্রেতা, বিক্রেতা এবং সরবরাহকারী তিন জন খুশী থাকলেই ব্যবসা লাভজনক হবে।"
আছে হতাশার গল্পও। গত বছর এই রেলওয়ে প্যারেডে একইসাথে মাংস এবং মুদি ব্যবসা চালু করে এক বছরের মাথায় তা বন্ধ করে দেন উদ্যোক্তা রাসেল রহমান। এসবিএস বাংলার পক্ষ থেকে তার কাছে জানতে চাওয়া হয় ব্যবসা বন্ধের কারণ।
রাসেল জানান, "অভিজ্ঞতা না থাকলে যা হয়। গ্রোসারিতে (মুদি দোকান) কিছুটা থাকলেও মাংসের ব্যবসায় আমার কোন অভিজ্ঞতা ছিল না। আরো একটি ব্যবসা থাকায় এখানে পুরো সময় দিতে পারতাম না, অনেকটাই কর্মী নির্ভর ছিলাম।"

ক্ষুদ্র ব্যবসায় ভালো করতে হলে সবার আগে ঠিক করতে হবে, কি ব্যবসা করতে চান? অর্থাৎ ব্যবসা সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা কতটুকু, অর্থের উৎস এবং ধারণক্ষমতা। দ্বিতীয়ত নির্ধারণ করতে হবে বিনিয়োগের পরিমান? এবং সবশেষ ঠিক করতে হবে ব্যবসার কাঠামো। অর্থাৎ ব্যবসা কি ব্যক্তি মালিকানাধীন, অংশীদারিত্ব নাকি কোম্পানি? এসব পরামর্শ দিয়েছেন চাটার্ড একাউন্টেন্ট কামরুল ইসলাম।
"ব্যবসায় ভালো করতে হলে এই তিনটি বিষয়ে হোমওয়ার্ক জরুরী। বেশীরভাগ উদ্যোক্তাই তা করেন না। ফলে আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হন তারা," বলেছেন কামরুল।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য অস্ট্রেলিয়া সরকারের নেয়া পদক্ষেপে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ী জামাল এবং শামীম। তবে, রেলওয়ে প্যারেড এলাকায় পার্কিং সুবিধা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন সবাই।
সিটি অব ক্যান্টারবারি ব্যাংকসটাউনের অন্তর্ভুক্ত অঞ্চল রেলওয়ে প্যারেড। এ কাউন্সিলের একজন কাউন্সিলর মোহাম্মদ জামান। যিনি একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীও। ব্যবসার শুরুর দিকে বেশ কয়েকবার হামলা হয়েছিল তার ওপর। চুরি- ডাকাতি হয়েছে তার দোকানে। তবে, বর্তমান অবস্থা আগের চেয়ে অনেক ভালো বলে দাবি তার।

"পার্কিং সমস্যা নিরসনে এরমধ্যে বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে কাউন্সিল। পার্কিং এর জায়গা বাড়ানোর ব্যাপারেও কাজ করছি আমরা," জানিয়েছেন কাউন্সিলর মোহাম্মদ জামান।
