শপথগ্রহণের ভাষণের সময়ে ভারতের নবনিযুক্ত রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু জানিয়েছেন, তিনি এক প্রগতিশীল দেশের রাষ্ট্রপতি। তিনিই ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি যিনি স্বাধীনতার পর জন্মগ্রহণ করেছেন। তাই দেশবাসীকে একসঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আশা পূরণের ডাক দিয়েছেন তিনি।
দেশের প্রথম আদিবাসী রাষ্ট্রপতি হিসাবে নিজের ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, হাজার বছর ধরে প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে জীবন চালিয়ে যাওয়া আদিবাসী সমাজে জন্মগ্রহণ করেছেন তিনি। শপথগ্রহণের সময় দেশের সেনাবাহিনীকে আসন্ন কার্গিল বিজয় দিবস উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন দেশের নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ড. দ্রৌপদী মুর্মু।

স্বাধীনতার ৭৫ বছরে তেরেঙ্গা শাড়ি পড়ে দিল্লির সেন্ট্রাল ভবনে শপথ নিয়েছেন ভারতের পঞ্চদশতম রাষ্ট্রপতি ড. দ্রৌপদী মুর্মু। শপথগ্রহণের আগে সকালে রাজঘাটে মহাত্মা গান্ধীর সমাধিস্থলে মালা ছড়িয়ে মাথা ঠেকিয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন দেশের নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি।
এরপর আগামী ৫ বছরের জন্য তাঁর বাসস্থান রাষ্ট্রপতি ভবনে পৌঁছেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। সেখানে তাঁকে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন বিদায়ী রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ, তাঁর স্ত্রী এবং কন্যা। রাষ্ট্রপতি ভবনে গার্ড অফ অনার দেওয়া হয় তাঁকে। এরপর রাইসিনা থেকে সংসদের দিকে কনভয় নিয়ে রওনা দেন দ্রৌপদী মুর্মু ও রামনাথ কোবিন্দ। সংসদের সেন্ট্রাল ভবনে বিদায়ী রাষ্ট্রপতি, উপ-রাষ্ট্রপতি, লোকসভার স্পিকার এবং প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সেন্ট্রাল ভবনে প্রবেশ করেন ড. দ্রৌপদী মুর্মু।
জাতীয় সংগীত দিয়ে শুরু হয় শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠান। তাঁর শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, উপ-রাষ্ট্রপতি বেঙ্কাইয়া নাইডু, লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা, একাধিক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্যপাল এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা। শপথগ্রহণের সময় উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর মেয়ে ইতশ্রী ও জামাই গণেশ। শপথগ্রহণের পর লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা সংসদের তরফ থেকে তাঁকে স্বাগতবার্তা জানিয়েছেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়ক। যে রাজ্যে জন্মেছেন নতুন রাষ্ট্রপতি। ওড়িশার ময়ূরভঞ্জের উপেরবেদা গ্রামের বাসিন্দারা রবিবার রাত থেকেই উল্লাসে মেতেছেন। কারণ সেই গ্রামেরই মেয়ে সোমবার ভারতের নতুন রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথগ্রহণ করেছেন।
দ্রৌপদী মুর্মু হলেন ভারতের প্রথম প্রেসিডেন্ট, যিনি স্বাধীন দেশে জন্মগ্রহণ করেছেন। শপথগ্রহণের পর প্রথা মেনে তাঁকে ২১ বার বন্দুকের তোপ দিয়ে সম্মান জানানো হয়। সংসদের সেন্ট্রাল হলে রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথম ভাষণ দিয়েছেন ড. দ্রৌপদী মুর্মু। দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নির্বাচিত হওয়া ড. দ্রৌপদী মুর্মু দেশের সর্বকনিষ্ঠ রাষ্ট্রপতি। বক্তব্য পেশ করতে এসে ড. দ্রৌপদী মুর্মু বলেছেন, সকলের আশীর্বাদে তিনি দেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। প্রগতিশীল একটি দেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। নিজেকে খুব সৌভাগ্যবতী মনে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আমিই দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া প্রথম ব্যক্তি যে ভারতের স্বাধীনতার পরে জন্মগ্রহণ করেছে। ভারতের নাগরিকদের কাছে আমার আবেদন, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে আমাদের সকলকে একসঙ্গে চেষ্টা করতে হবে।
উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৬৪ শতাংশ ভোট পেয়েছেন ড. দ্রৌপদী মুর্মু। রাষ্ট্রপতি হিসাবে জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ভোটমূল্য ছিল ৫ লক্ষ ৪০ হাজার ৯৯৬। দ্রৌপদী তৃতীয় রাউন্ড গণনার পরেই পেয়ে যান ৫ লক্ষ ৭৭ হাজার ৭৭৭ মূল্যের ভোট।
উত্তরপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্র থেকে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ভোট পেয়েছেন ড. দ্রৌপদী মুর্মু। ওড়িশার ময়ূরভঞ্জের সাঁওতাল পরিবারের সন্তান ড. দ্রৌপদী মুর্মুর জয়ের পরই উৎসবে মেতে ওঠেন আদিবাসী সমাজের মানুষরা।
ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার রায়রাংপুর কেন্দ্রের প্রাক্তন বিধায়ক ড. দ্রৌপদী মুর্মু। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি একটি স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন। ২০০০ ও ২০০৪ সালে বিধানসভা নির্বাচনে জিতে নবীন পট্টনায়কের নেতৃত্বাধীন বিজেডি-বিজেপি জোট সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন তিনি। সামলেছিলেন, পরিবহণ, পশুপালন, মৎস্য দফতর। ২০০৭ সালে ওড়িশার সেরা বিধায়ক হয়েছিলেন তিনি। এরপর ড. দ্রৌপদী মুর্মু ২০১৫-এর মে থেকে ২০২১ সালের জুলাই পর্যন্ত ঝাড়খণ্ডের রাজ্যপাল ছিলেন।
অন্যদিকে, বিদায়ী রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ মনে করেন, একুশ শতককে নিজেদের শতকে পরিণত করার ক্ষমতা রয়েছে ভারতের। অবসরের আগে নিজের শেষ ভাষণে সেই কথাই জানিয়েছেন তিনি। ভারতের গণতন্ত্র ব্যবস্থার শক্তিকে কুর্নিশ করেছেন। শেষ ভাষণে বিদায়ী রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ বলেছেন, পাঁচ বছর আগে এই দিনে আপনারা আমার ওপর আস্থা রেখেছিলেন। আমাকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করেছিলেন আপনাদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে। আমি আপনাদের কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
তিনি আরও বলেছেন, উনিশ শতকে দেশে স্বাধীনতার জন্য বহু সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছিল। সেই সংগ্রামের অনেক নায়কই সেদিন দেশবাসীর মনে আশা জাগালেও আজ বিস্মৃত। এখন সে সব বীরত্বের কাহিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে মনে করা হয়। তাঁর বিশ্বাস, ২১ শতককে ভারত নিজের শতাব্দীতে পরিণত করবে।
Follow SBS Bangla on FACEBOOK.
এসবিএস বাংলার অনুষ্ঠান শুনুন রেডিওতে, এসবিএস বাংলা রেডিও অ্যাপ-এ এবং আমাদের ওয়েবসাইটে, প্রতি সোম ও শনিবার সন্ধ্যা ৬ টা থেকে ৭ টা পর্যন্ত। রেডিও অনুষ্ঠান পরেও শুনতে পারবেন, ভিজিট করুন: এসবিএস বাংলা।
আমাদেরকে অনুসরণ করুন ফেসবুকে।
