অস্ট্রেলিয়ায় এখন হেমন্ত ঋতু চলছে। গাছের পাতা ঝড়ার মৌসুম এখানে আর বাংলাদেশে বৈশাখ। প্রথম বৃষ্টির সময় থেকে জুম চাষের তোড়জোড় শুরু হবে। বসন্তের শেষান্তে প্রকৃতি ও প্রাণ জেগে উঠে নতুন মৌসুমের আগমনে। পাহাড়ি বিঝু পাখির কন্ঠে শোনা যায় মুহুর্তের আগমনী বার্তা — “হাত্তোল পাগোক, বিঝু এত্তোক…” মানে, “কাঁঠাল পাকুক, বিঝু আসুক”।
কান পাতলে শোনা দূর দূরান্ত থেকে শোনা যায় বাঁশি আর ঢোলের আওয়াজ। পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর নববর্ষের উৎসব, প্রাণের উৎসব বৈসাবির আয়োজন শুরু হয়।

প্রকৃতি আর প্রাণের ঐকতানে বাঁধা মানুষের জীবন। পুরো দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে যে উৎসবকে সবাই নানান নামে ডাকে- বিহু, বেসাখ, চংক্রাণ, থিংগ্যান; পাহাড়িরা তাকে বলে সাংগ্রাই, বিঝু, বৈষু, বিষু ইত্যাদি। সংক্ষেপে তাকে ডাকা হয় বৈ-সা-বি।
দেশ থেকে দূরে থাকলেও পাহাড়িয়া মন পড়ে থাকে বাংলাদেশের সবুজ পর্বতমালায়। তাই তো প্রবাসী পাহাড়িরাও অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন শহরে বৈ-সা-বির নানান আয়োজনে উৎসবে মেতে উঠে।

এ বছর বিভিন্ন শহরে বসবাসরত জুম্মদের ঘরে ঘরে বৈ-সা-বির আয়োজন হয়েছে। সম্মিলিতভাবে আয়োজিত হয়েছে জলাশয়ে ফুল নিবেদন, আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

সিডনীতে এবারের আয়োজনে নতুন অনেক কিছুই যোগ হয়েছিল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন লরি ফার্গুসন, (ওএএম- The Medal of the Order of Australia) এবং তার স্ত্রী প্যারামাটা কাউন্সিলের সাবেক লর্ড মেয়র মরিন ওয়ালশ।
আরও উপস্থিত ছিলেন, প্যারামাটার সাবেক ডেপুটি লর্ড মেয়র, এমপি জুলিয়া ফিন এবং একুশে একাডেমি অস্ট্রেলিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদুল মতিন।
বিশেষ আয়োজনের মধ্যে ছিল বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মাননা, গুণিজন সম্বর্ধনা ও নতুন অভিবাসীদের স্বাগত জানানো।
দেশ থেকে দূরে থাকলেও পাহাড়িয়া মন পড়ে থাকে বাংলাদেশের সবুজ বন-পাহাড়ে। তাই প্রবাসী পাহাড়িরা অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন শহরে বৈ-সা-বির নানান আয়োজনে উৎসবে মেতে উঠেন। কীসের টানে প্রতিবছর বিঝু পালন করেন জানিয়েছেন সিডনী নিবাসী তনু মুরং।

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরম্পরা রক্ষা আর পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে তা সঞ্চারিত রক্ষার চেতনা থেকে তিনি কমিউনিটির সাথে একাত্ম হয়ে বৈ-সা-বি পালন করে আসছেন।
তার ভাবনার সাথে মিলে যায় মেলবোর্ন নিবাসী লিয়া চাকমার ভাবনাও। তিনি বলেন,
বৈ-সা-বি আমাদের একমাত্র প্রধান উৎসব। এটি আমাদের আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
প্রতি বছরের মত এবারও তিনি ভিক্টোরিয়ান জুম্মর সাথে যুক্ত ছিলেন বৈ-সা-বি উৎসবের আয়োজনে।
এদিকে ক্যানবেরায় মহাসমারোহে বৈসাবি উৎসব উদযাপিত হয়েছে। এবারের আয়োজনে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছেন ফ্রান্স প্রবাসী সুচরিতা ত্রিপুরা। তিনি ত্রিপুরা জাতি তথা পাহাড়িদের একজন স্বনামধন্য নৃত্যশিল্পী।

ব্যস্ত প্রবাস জীবনে অবিকল দেশের মত করে বিঝু আয়োজন করা সম্ভব নয়। তাই বলে কী বিঝু থেমে থাকবে? দেশের মত করে রীতি-রেওয়াজ মেনে তিন দিন বা এক সপ্তাহ ধরে বৈসু-সাংগ্রাই-বিঝু পালন করা সম্ভব নয়। তাই অস্ট্রেলিয়ার জুম্মরা সবাই সামিল হতে পারে এমন দিনে একত্রিত হয়ে বৈসাবি পালন করে থাকেন।

বান্দরবানের সন্তান ডাক্তার চাই শোয়ে প্রু বলেন, দেশের সাথে অস্ট্রেলিয়ায় সাংগ্রাই উদযাপনে অনেক পার্থক্য থাকে। তবে যতদূর সম্ভব রীতি
-রেওয়াজ মেনে তিনি স্থানীয় জুম্ম কমিউনিটির সাথে মিলে বৈ-সা-বির আয়োজন করে থাকেন। পুরাতন বছরকে বিদায় জানানোর সাথ সাথে মারমারা জীর্ণতাকে মুছে দিয়ে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও নতুন বছরের উৎসবের মধ্য দিয়ে সাংগ্রাই পালন করে থাকেন।

প্রতিবেদনটি শুনতে উপরের অডিও-প্লেয়ারটিতে ক্লিক করুন।
এসবিএস বাংলার অনুষ্ঠান শুনুন রেডিওতে, এসবিএস বাংলা রেডিও অ্যাপ-এ এবং আমাদের ওয়েবসাইটে, প্রতি সোম ও শনিবার সন্ধ্যা ৬ টা থেকে ৭ টা পর্যন্ত।
রেডিও অনুষ্ঠান পরেও শুনতে পারবেন, ভিজিট করুন: আমাদের ওয়েবসাইট।
আমাদেরকে অনুসরণ করুন ফেসবুকে।
পডকাস্টে মারমাদের পানিখেলার ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীত ও সৌরভ টিনটিন চাকমার কম্পোজিশন ব্যবহৃত হয়েছে।









