এই বছরের দিওয়ালি বা দীপাবলি ২৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে।
'আলোর উৎসব' নামেও পরিচিত এই উৎসবটি সাধারণত পাঁচ দিন ধরে চলে।
অস্ট্রেলিয়ায় দশ লক্ষেরও বেশি হিন্দু, জৈন, বৌদ্ধ এবং শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ উৎসবটি পালন করে, যেটি তিহার এবং বান্দি ছোড় দিবস নামেও পরিচিত।
উৎসবটি অশুভর ওপরে শুভর জয় এবং অন্ধকারের ওপর আলোর জয়কে জানান দেয়।
এটি ধন্যবাদ জানানোর এবং সুস্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করারও একটি সময়।

ড. জয়ন্ত বাপট একজন হিন্দু পুরোহিত এবং মেলবোর্নের মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের গবেষক।
তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে দিওয়ালি শব্দটি সংস্কৃত দীপাবলি থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।
দীপ মানে 'প্রদীপ' আর অবলী মানে 'সারি'। দীপাবলির সবচেয়ে সাধারণ অর্থ হল 'প্রদীপের সারি'।ড. জয়ন্ত বাপট, একজন হিন্দু পুরোহিত এবং মেলবোর্নের মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের গবেষক
প্রতিটি অঞ্চলের ঐতিহ্যের উপর নির্ভর করে সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়ে উদযাপনগুলি আলাদা হয়ে থাকে।
প্রতি বছর দিওয়ালি পালিত হয় হিন্দু ক্যালেন্ডারের আশ্বিন ও কার্তিকে, যা সাধারণত অক্টোবর বা নভেম্বর মাসে হয়ে থাকে।

ঐতিহ্যগতভাবে এটি পালনের সময় 'দিয়া' নামক মাটির তৈরি প্রদীপ জ্বালানো হয়। এ সময় শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্করাও আতশবাজি জ্বালায়।
অনেকের কাছে 'রঙ্গোলি' ছাড়া উদযাপন সম্পূর্ণ হয় না, এটি এক ধরণের রঙিন নিদর্শন যাকে দক্ষিণ ভারতের লোকেরা 'কোলাম' বলে থাকে।
হিন্দু দেবী লক্ষ্মীকে স্বাগত জানাতে এবং সৌভাগ্য আনতে দীপাবলির সময় এই নিদর্শনগুলি প্রতিদিন সকালে আঁকা হয়।
এই সময়ে পরিবার-পরিজন এবং তাদের বন্ধুরা নাচ-গান করে, মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করে এবং উপহার বিনিময় করে।
সম্পদ এবং সমৃদ্ধির আশায় আলো জ্বালানোর আগে ঘরদোর পরিষ্কার করা হয়। কেউ কেউ এমনকি তাদের বাড়িঘর নতুন করে রঙে করে।

অস্ট্রেলিয়ায় দিওয়ালি
অস্ট্রেলিয়ায় ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে আসা জনসংখ্যা বাড়ছে, তারা তাদের এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে রাজধানী শহর এবং অন্যান্য আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোতে দীপাবলি উদযাপন করে।
মেলবোর্নের একজন বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী এবং কোরিওগ্রাফার তারা রাজকুমার ওএএম বলেছেন, সাম্প্রতিক দশকগুলোতে উৎসবের ব্যাপকতা বেড়েছে।
"আমি যখন ১৯৮৩ সালে অস্ট্রেলিয়ায় আসি, তখন দীপাবলি পালিত হত বাড়িতে বা ছোট ছোট সমাবেশের মধ্যে, কিন্তু এখন এটি আরও ব্যাপকভাবে উদযাপন করা হচ্ছে," মিজ রাজকুমার বলেন।
"উপমহাদেশ থেকে অভিবাসন বৃদ্ধির সাথে এর অনেক সম্পর্ক রয়েছে এবং দীপাবলি হিন্দু ক্যালেন্ডারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হিসাবে স্বীকৃত।"
এখন অস্ট্রেলিয়া জুড়ে দীপাবলি কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। মেলবোর্নের ফেডারেশন স্কোয়ার থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত, আমরা উদযাপনের লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি।তারা রাজকুমার
"দীপাবলির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল অন্তর্জগতে রূপান্তরের ধারণা, এটি ঘটে যখন আলো দিয়ে অজ্ঞতা দূর করা হয়," তিনি যোগ করেন।
উদযাপনের পেছনের গল্প
হিন্দু সম্প্রদায় সাধারণত পাঁচ দিন ধরে দীপাবলি উদযাপন করে।
এটি ধনত্রয়োদশী বা ধনতেরাস দিয়ে শুরু হয়, এদিন সোনা বা রৌপ্য কেনা শুভ বলে মনে করা হয়।
"এই দিনে লোকেরা বাচ্চাদের জন্য উপহার কেনে। সবাই নতুন জামাকাপড় পরে, ঘরদোর পরিষ্কার করা হয়, লোকেরা সোনা এবং রূপা কিনে। এই দিনটি দেবী লক্ষ্মীর পূজা করার," বলেছেন ড. বাপট।

দ্বিতীয় দিনটিকে বলা হয় চতুর্দশী, যার সাথে মিশে আছে ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়ে বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনীর গল্প।
"এমনি একটি পৌরাণিক কাহিনী হল - নরকাসুর নামে একজন রাক্ষস রাজা ছিলেন যিনি ভগবান কৃষ্ণের দ্বারা পরাজিত হয়ে নিহত হয়েছিল," বিষয়টি ড. বাপট ব্যাখ্যা করে বলেন, এই দিনে অনেক লোক দেবী লক্ষ্মীকে স্বাগত জানাতে তাদের ঘরের সামনে এবং নদীর তীরে সারি সারি প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছিল।
তৃতীয় দিনে পালিত হয় সম্পদের দেবী লক্ষ্মী পূজা, দিনটি এজন্য সবচেয়ে শুভ বলে মনে করা হয়।
"যেমন, এই দিনে ব্যবসায়ীরা তাদের হিসাবের বই এবং অর্থের পূজা করে," ড. বাপট বলেন।
ভারতের অনেক জায়গায় এই দিনটি ১৪ বছর নির্বাসনে থাকার পর ভগবান রাম, তাঁর স্ত্রী সীতা দেবী এবং ভাই লক্ষ্মণকে তাদের জন্মভূমি অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তনের জন্য স্মরণ করা হয়।
চতুর্থ দিন পালিত হয় গোবর্ধন পূজা, এটি উত্তর ভারতে উদযাপন করা হয়।
"পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, ভগবান কৃষ্ণ তাঁর মানুষকে প্রকৃতির ক্রোধ থেকে রক্ষা করেছিলেন পর্বত গোবর্ধনকে এক আঙুলে ধরে রেখে। ভগবান কৃষ্ণ ভগবান ইন্দ্রকে পরাজিত করার কারণে দিনটি উদযাপন করা হয়।"
শেষ দিন পালিত হয় 'ভাই দুজ', এটি ভাইবোনদের একটি উদযাপন। এদিন বোনেরা তাদের ভাইদের কপালে একটি লাল দাগ আঁকে তাদের ভালবাসার বন্ধনকে সম্মান করার জন্য।
ভারত একটি বৈচিত্র্যময় জাতি হওয়ায় দীপাবলি অঞ্চল ভেদে ভিন্নভাবে উদযাপন করা হয়।
"যেমন, লক্ষ্মী সম্পদের দেবী, কিন্তু বাংলায় এজন্য তারা লক্ষ্মী নয়, দেবী কালীর পূজা করে। গুজরাটে, বিষ্ণুর পূজার পাশাপাশি হনুমানেরও পূজা করা হয়। কর্ণাটকে সাধারণত কুস্তি বা শরীরচর্চ্চা প্রদর্শন করা হয়। শিশু-কিশোররা কাদামাটির দুর্গ তৈরী করে," ড. বাপট ব্যাখ্যা করেন।

নেপালে তিহার উদযাপন
নেপালি সম্প্রদায়ের কাছে দিওয়ালি তিহার নামে পরিচিত।
পাঁচ দিন ধরে অনুষ্ঠান চলে, যেখানে কাক, কুকুর এবং গরুর মতো প্রাণীদের উৎসর্গ করে উদযাপন করা হয়।
প্রথম দিন কাকের জন্য উৎসর্গ করা হয়, যা যমপঞ্চক বা "কাগ তিহার" নামে পরিচিত, কারণ এটি মানুষকে তাদের ঘর এবং আশেপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে।
দ্বিতীয় দিনটি "কুকুর তিহার" নামে পরিচিত এবং এটি কুকুরদের জন্য উৎসর্গ করা হয়, যারা তাদের আনুগত্যের জন্য আদৃত।
কুকুরগুলিকে স্নান করানো হয়, পূজা করা হয় এবং সুস্বাদু খাবার পরিবেশন করা হয়।
"গাই তিহার", যা সাধারণত তৃতীয় দিনে পালিত হয়, এটি গরুকে উৎসর্গ করা হয়, যাকে পবিত্র এবং মাতৃত্বের প্রতীক বলে মনে করা হয়।

সাধারণত, চতুর্থ দিনে, "গরু তিহার" নামে পরিচিত, নেপালিরা ষাঁড়দের সম্মান করে কারণ এটি কৃষকদের জমি প্রস্তুত করতে সাহায্য করে।
একই দিনে, কাঠমান্ডু উপত্যকা এবং আশেপাশের এলাকার নেওয়ার সম্প্রদায়ের লোকেরা "মহা পূজা" পালন করে, যার অর্থ "নিজেকে পূজা"।
শেষ দিনটিকে "ভাই টিকা" বলা হয় এবং এটি ভাইবোনদের জন্য উৎসর্গ করা হয়। ভাইরা এক জায়গায় বসেন এবং তাদের বোনরা তেল এবং জল নিয়ে তাদের পাশে চক্রাকারে ঘোরে যাতে তাদেরকে মৃত্যুর দেবতা যম থেকে রক্ষা করা যায়।
বান্দি ছোড় দিওয়াস
বান্দি ছোড় দিওয়াস (দিবস) হল একটি ছুটির দিন যেটিকে "শিখ দিওয়ালি" বলা হয়।
অস্ট্রেলিয়ার শিখ সম্প্রদায়ের একজন অভিজ্ঞ উৎসব সংগঠক গুরিন্দর কৌর ব্যাখ্যা করে বলেন, এটি "স্বাধীনতার উদযাপন" নামেও পরিচিত, এটি সপ্তদশ শতকে গোয়ালিয়র কারাগার থেকে ষষ্ঠ শিখ গুরু, গুরু হরগোবিন্দের মুক্তির স্মৃতিচারণ করে পালিত হয়।
গুরু যখন মুক্তি পেতে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি ক্ষমতাসীন মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছে আরো ৫২ জন বন্দী রাজার মুক্তির জন্য অনুরোধ করেছিলেন।
সম্রাট যতক্ষণ পর্যন্ত গুরু হরগোবিন্দের পোশাক ধরে রাখতে পারেন ততক্ষণ সমস্ত রাজাদের মুক্তি দিতে রাজি হন। তদনুসারে, তিনি ৫২টি কাপড়ের লেজ দিয়ে একটি চাদর তৈরি করেছিলেন।
বান্দী মানে 'বন্দী' আর ছোড় মানে 'মুক্তি'। এই দিনের প্রধান বার্তা হল যে গুরু শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যের মানবাধিকারের জন্যও অবস্থান নিয়েছিলেন।গুরিন্দর কৌর
অস্ট্রেলিয়ার শিখরা তাদের নিকটতম গুরুদ্বারে এবং বাড়িতে 'বান্দি ছোড় দিবস' উদযাপন করে।
"এদিন শিখরা গুরুর আশীর্বাদ নেয়, গুরুদ্বারে মোমবাতি জ্বালায় এবং মিষ্টি বিনিময় করে," মিজ কৌর বলেন।

"বাড়িতে উপহার এবং মিষ্টি বিনিময় হয়, এবং নিরাপদে এবং অনুমোদন নিয়ে আতশবাজি জ্বালানো হয়," মিজ কৌর যোগ করেন।
দিওয়ালি, দীপাবলি, বান্দি ছোড় দিওয়াস এবং তিহার সম্পর্কে আরও খবরের জন্য এসবিএস ওয়েবসাইট দেখুন।
এসবিএস বাংলার অনুষ্ঠান শুনুন রেডিওতে, এসবিএস বাংলা রেডিও অ্যাপ-এ এবং আমাদের ওয়েবসাইটে, প্রতি সোম ও শনিবার সন্ধ্যা ৬ টা থেকে ৭ টা পর্যন্ত। রেডিও অনুষ্ঠান পরেও শুনতে পারবেন, ভিজিট করুন: এসবিএস বাংলা
আমাদেরকে অনুসরণ করুন ফেসবুকে
