অস্ট্রেলিয়ায় আইডেন্টিটি ক্রাইম বা ব্যক্তিগত তথ্য সংক্রান্ত অপরাধ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এ ধরনের প্রতারণার কারণে সরকার, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ও জনসাধারণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর দৈনন্দিন জীবনে আমরা সবাই সাইবার ক্রাইম বা অনলাইন প্রতারণার ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছি। যে কোন অসচেতন মুহুর্তে আমরা পরিচয় চুরির শিকার হতে পারি। ব্যক্তিগত তথ্য-পরিচয় কীভাবে চুরি হতে পারে তা জানার মধ্য দিয়ে আমরা সাইবার অপরাধের ঝুঁকি কমাতে পারি। এবার জানা যাক সাইবার দুনিয়ায় পরিচয় চুরি বলতে কী বুঝায়।
READ MORE

প্রতি আট মিনিটে একটি সাইবার অপরাধ
সিডনী ইউনিভার্সিটির স্কুল অফ কম্পিউটার সায়েন্সের সিনিয়র লেকচারার সুরাংগা সেনেভিরাত্নে পরিচয় চুরির বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন,
কারোর ব্যক্তিগত তথ্যাবলি চুরি করে কেউ যখন প্রতারণা বা আর্থিক সুবিধার জন্য তা ব্যবহার করেন, তখন তাকে পরিচয় চুরি বলা হয়।
এক্ষেত্রে স্ক্যামার বা প্রতারকরা অন্য কারোর ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে বা তার পরিচয়ে বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা যেমন ক্রেডিট কার্ড, ট্যাক্স রিটার্ন, সামাজিক পরিষেবা এমনকি ব্যাংক ঋণ নিয়ে থাকে। অনেক সময় ভুক্তভোগী ব্যক্তি এই জোচ্চুরির বিষয়ে কিছুই টের পাননা।

অস্ট্রেলিয়ান কম্পিটিশন এন্ড কনজিউমার কমিশন (ACCC) স্ক্যাম বা অনলাইন প্রতারণার বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে ও স্ক্যামিং রিপোর্টিং করতে স্ক্যামওয়াচ নামক একটি ওয়েবসাইট পরিচালিত করে আসছে। এই ওয়েবসাইট অনুযায়ী ২০২২ সালে অস্ট্রেলিয়ানরা ৫৬৮ মিলিয়ন ডলার ক্ষতির রিপোর্ট করেছেন, আগের বছরের তুলনায় যা ৮০% বেশি।
২০২১ সালে ক্ষতির পরিমান ছিল ৩২০মিলিয়ন ডলার। বিশেষজ্ঞদের মতে প্রকৃত ক্ষতির পরিমান আরও বেশি হবে কেননা অনেক ভুক্তভোগী ক্ষতির কথা কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেন না।
পরিচয় চুরি অনলাইন বা অফলাইন, অনেক প্রকারে হয়ে থাকে যেমন হ্যাকিং, ফিশিং, স্কিমিং, সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ডাম্পস্টার ডাইভিং। অনেক সময় আমরা অসচেতনভাবে ব্যক্তিগত তথ্য সম্বলিত কার্ড, পরিচয় পত্র, বিভিন্ন বিলের কাগজ, জরুরী নথিপত্র আবর্জনায় ফেলে দিই যা প্রতারকচক্র পরিচয় চুরি করতে কাজে লাগায়। একে ডাম্পস্টার ডাইভিং বলে।
অস্ট্রেলিয়ান কম্পিটিশন এন্ড কনজিউমার কমিশন (ACCC) এর ডেপুটি চেয়ার ক্যাটরিওনা লোয়ে বলেন, স্ক্যামারদের কাছে আপনার সামান্য তথ্যগুলোও মূল্যবান হতে পারে। টুকরো টুকরো তথ্য জড়ো করে তারা পরিচয় চুরিতে কাজে লাগায়।
আপনার বিষয়ে জানতে স্ক্যামাররা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সহ বিভিন্ন পাবলিক সোর্স কাজে লাগাতে পারে। ডেভিড লোয়ের মতে ফেসবুকের মত সামাজিক মাধ্যমে আপনার ছবি দেখে তারা আপনার পরিবারের বিষয়ে খোঁজ খবর নিতে পারে।

সাইবার ক্রিমিনালরা আপনার ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে কী করে থাকে বা কীভাবে তাকে কাজে লাগায় তা নির্ভর করে তাদের হাতে কী ধরনের আর কী পরিমানে তথ্য আছে।
ডক্টর লোয়ে জানান,
তারা আপনার ব্যাংক একাউন্টে ঢুকে সর্বস্ব লুট করে নিতে পারে বা আপনার নামে নতুন একাউন্ট খুলে ঋণ অথবা লাইন অফ ক্রেডিট নিতে পারে। তারা আপনার পরিচয়ে কোন ধরনের চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারে, আপনার নামে ফোন প্লান নিয়ে অপরাধ করতে পারে। তারা আপনার নামে ব্যয়বহুল পণ্য কিনতে পারে বা সরকারী পরিষেবা গ্রহণ করতে পারে। তারা আপনার ইমেইলে ঢুকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিতে পারে বা সামাজিক মাধ্যমে আপনার একাউন্টে ঢুকে আপনার ছদ্মবেশ নিতে পারে — আর এসব তথ্য কাজে লাগিয়ে নতুন করে স্ক্যাম করতে পারে।
অনলাইন প্রতারণা থেকে আত্মরক্ষার্থে অনলাইন স্টোর সহ কোন অপরিচিত ওয়েবসাইটে ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার আগে ভালভাবে যাচাই করা দরকার।

ডক্টর লোয়ে আরও বলেন,
“সন্দেহজনক মেসেজ বা ইমেইল খোলা উচিৎ না এবং এধরণের ইমেইলে থাকা লিংকে ক্লিক করা উচিৎ না। সুরক্ষিত থাকতে মেসেজ বা ইমেইল ডিলিট করে ফেলুন। কোন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের
যোগাযোগের মাধ্যম সঠিক আর বৈধ কিনা তা যাচাই করে নিন।“
অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে জাতীয় পরিচয় ও সাইবার সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা আইডিকেয়ার এর কমিউনিটি আউটরিচ এর ম্যানেজার সারাহ কাভানাহ বলেন,
ফোনে নিজের ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিৎ, যেমন ড্রাইভার লাইসেন্স, পাসপোর্ট, মেডিকেয়ার এবং ব্যংকে লগ ইন তথ্য। ফোনের ওপাশে কার সাথে কথা বলছেন বা কাকে নিজের ব্যক্তিগত তথ্য দিচ্ছেন তার পরিচয় ভালভাবে জেনে নিতে হবে আর নিশ্চিত হতে হবে।
মিস কাভানাহ ব্যক্তিগত নথিপত্র বাসায় সুরক্ষিত স্থানে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন, বিশেষ করে যখন আপনি ভ্রমণ করছেন। আপনার মেইলবক্স লক করে রাখুন এবং যেসব ব্যক্তিগত তথ্যের আর দরকার নেই সেসব ধ্বংস করে ফেলুন। প্রত্যেকটি অনলাইন একাউন্টের জন্য স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী পাসওয়ার্ড নির্ধারিত রাখা দরকার।

এবার আলোচনা করা যাক, আপনার পরিচয় চুরি হয়ে গেলে কী করবেন। অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা নিজের পরিচয় চুরি হওয়ার কথা টের পাননা। আপনার পরিচয় চুরি হয়েছে কিনা বা কেউ তার অপব্যবহার করছে কিনা সে বিষয়ে সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছেন মিস কাভানাহ।কী দেখে টের পাবেন আপনার আইডি হ্যাক হয়েছে? যখন দেখবেন,
আপনার প্রত্যাশিত ইমেইলটি আর আসছে না। আপনার ব্যাংক বা ক্রেডিট কার্ড স্টেটমেন্ট-এ অচেনা কোন লেনদেন দেখা যাচ্ছে। যখন আপনি অনাকাংক্ষিত বিল, ইনভয়েস বা পণ্য ক্রয়ের রশিদ পেতে থাকবেন বা কোন ঋণ আবেদন ফেরত এসেছে।
যদি আপনি সন্দেহ করেন যে আপনি পরিচয় প্রতারণার শিকার হয়েছেন, তবে আপনি ক্রেডিট রিপোর্টিং কোম্পানিকে অনুরোধ করতে পারেন যারা ভোক্তা ক্রেডিট রিপোর্ট বন্ধ করে দিতে পারে।
সিডনী ইউনিভার্সিটির ডিসিপ্লিন অফ ফাইনান্স এর সিনিয়র লেকচারার এন্ড্রু গ্রান্ট বলেন, ক্রেডিট ব্যান করা হলে আপনার ক্রেডিট রিপোর্ট কেউ দেখতে পারবে না।
ডক্টর গ্র্যান্ট আরও বলেন ক্রেডিট ব্যান করার প্রক্রিয়া খুবই সহজ। অস্ট্রেলিয়ার তিনটি ক্রেডিট রিপোর্টিং সংস্থার মাধ্যমে ক্রেডিট ব্যান করা যায়।
সব ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করার পরও পরিচয় চুরি হতে পারে। ডক্টর গ্রান্ট নিজেও বিদেশ ভ্রমণকালে পরিচয় চুরির শিকার হয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণকালে পানীয় স্পর্শ আর ফেশিয়াল রিকগনিশন মাধ্যমে তার ফোন আনলক হয়ে গিয়েছিল।
ডক্টর লোয়ে এবং স্ক্যামওয়াচ সতর্কতা জানিয়ে বলেন,
স্ক্যামাররা দিনে দিনে আরও অত্যাধুনিক ও জটিল দক্ষতা সম্পন্ন হয়ে উঠছে। আমরা জনসাধারণকে তিনটি শব্দ মনে রাখার আহবান জানাই, — থামুন, ভাবুন আর রক্ষা করুন।
যেকোন লেনদেন প্রক্রিয়ার আগে থামুন, আর ভাবুন ওপাশে যার সাথে লেনদেন করছি, তাকে কী আমি চিনি? যদি নিজেকে স্ক্যাম বা প্রতারণার ভুক্তভোগী মনে করেন, তাহলে সংগে সংগে আইডি কেয়ারে যোগাযোগ করুন আর স্ক্যামওয়াচে অভিযোগ রিপোর্ট করুন।
সহায়ক তথ্যভান্ডার:
স্ক্যামের শিকার হলে স্ক্যামওয়াচের অনলাইন ফর্মে অবহিত করুন, অথবা রিপোর্টসাইবার এর ওয়েবসাইটে রিপোর্ট করুন।
- আইডি চুরির বিষয়ে চিন্তিত হলে আইডিকেয়ারেযোগাযোগ করুন করুন- 1800 595 160 (Aus) or 0800 121 068 (NZ).
- আইডেন্টিটি ক্রাইম এবং স্ক্যাম বিষয়ে হালনাগাদ খবরাখবর জানতে স্ক্যামওয়াচের ওয়েবসাইট ভিজিট করুন।










