মধ্যপ্রাচ্যে চলতে থাকা যুদ্ধের দৃশ্য আমরা কিছু দিন ধরে দেখে আসছি। কিন্তু সেটির সাথে সাথে আরেকটি যুদ্ধ চলছে ঠিক আপনার ফোনের স্ক্রিনে— সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে ওই অঞ্চলকে ঘিরে বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা।
এসবিএস এক্সামিনস-এর এই পর্বে আমরা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা নিয়ে, জেনেছি কীভাবে ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত করা যায়, আর শুনেছি এসবিএস পার্সিয়ান সাংবাদিক নিব সাদরোলদাবাইয়ের কাছ থেকে— তাঁর জন্মভূমি ইরান থেকে কী ধরনের তথ্য ও কনটেন্ট আমাদের সামনে আসছে।
নিব বলছেন, তিনি কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হন, যখন একটি ভিডিও তাঁর নজরে আসে— যা তাঁর কাজ করা একটি প্রতিবেদনের জন্য একেবারে উপযুক্ত মনে হয়েছিল। সেটি ছিল ইরানের বন্দিদের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ে।
তিনি বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ভিডিওটি ঘুরছিল, তাতে দেখা যাচ্ছিল বন্দিদের তেহরানের এভিন কারাগার থেকে অন্য একটি স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।"
প্রথম দেখায় ভিডিওটি আমার কাছে যথেষ্ট ঠিকঠাক মনে হয়েছিল। আর সেটি গুরুত্বপূর্ণও ছিল, কারণ যেমনটা বলেছি, ইরান থেকে এ ধরনের ফুটেজ পাওয়া খুবই কঠিন।
"কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরে আমি এমন একজন বিশেষজ্ঞের সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলাম, যিনি দীর্ঘদিন ইরানে কারাবন্দি ছিলেন এবং কারাগারগুলো খুব ভালোভাবে চেনেন। কথা বলার সময় তিনি আমাকে সতর্ক করেন যে ভিডিওটিতে কিছু একটা সমস্যা আছে।”
নিব আবার ভিডিওটি দেখেন এবং সেখানে কিছু সন্দেহজনক বিষয় খুঁজে পান।
তিনি বলেন,
ভিডিওতে জুম করলে দেখা যায়, একজন মানুষ হঠাৎ করে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে, আবার আরেকজন খুব অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাঁটছে।
"কিন্তু একজন ইরানি সাংবাদিক হিসেবে আমার কাছে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় ছিল— ভিডিওটি নাকি ধারণ করা হয়েছিল আমার নিজের শহরে। আর ভিডিওর যেসব জায়গা দেখানো হচ্ছিল, সেগুলো দিয়ে আমি হয়তো বহুবার হেঁটেছি। আমি সেই এলাকাগুলো খুব ভালো করেই চিনতাম। তাই নিজের শহরকে ঘিরে তৈরি একটি ভিডিওর মাধ্যমে প্রায় বিভ্রান্ত হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আমার জন্য খুবই উদ্বেগজনক ছিল।”
ড. ডারা কনডিউইট মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সিনিয়র লেকচারার।
তিনি বলছেন, মানুষ এখনো এমন পর্যায়ের মিডিয়া সচেতনতা অর্জন করেনি, যাতে সহজে বোঝা যায় কোনটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি আর কোনটি নয়।
বিভ্রান্তিমূলক তথ্য বা ডিসইনফরমেশন খুবই শক্তিশালী একটি হাতিয়ার। আমরা সাধারণত ভাবি, ডিসইনফরমেশন মানে কোনো নির্দিষ্ট বয়ান ছড়িয়ে দেওয়া। কিন্তু এর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাবগুলোর একটি হলো মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি করা।
"বিষয়টি এমনও হতে পারে না যে ইরানি সরকার একটি নির্দিষ্ট বার্তা দিচ্ছে— বরং তারা অনেক ধরনের বয়ান ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য যথেষ্ট। ফলে মানুষ হয় বিষয়টি থেকে দূরে সরে যায়, নয়তো তারা আর কোনো তথ্যকেই বিশ্বাস করতে চায় না।”
আরএমআইটির এআই অ্যান্ড ডাটা অ্যানালিটিক্স হাবের সিনিয়র লেকচারার ড. শাহরিয়ার কায়সার বলছেন, এখন খুব দ্রুতগতিতে ভুয়া ছবি ও ভিডিও তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।
সশস্ত্র সংঘাতের ক্ষেত্রে যুদ্ধ এখন শুধু মাটিতেই হয় না। বর্তমানে যুদ্ধ হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সংবাদমাধ্যমেও।
আমরা শুনেছি, এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত করা কতটা কঠিন হতে পারে— এমনকি নিবও তাঁর নিজের শহরের ভিডিও দেখে প্রায় বিশ্বাস করে ফেলেছিলেন।
তবে ড. কাইসার কিছু পরামর্শ দিয়েছেন, যা আমরা সবাই ব্যবহার করতে পারি।
তিনি বলেন, “বর্তমানে ডিপফেইক, ভুয়া ছবি, ভুয়া সংবাদ, এমনকি নিবন্ধ বা ভিডিও শনাক্ত করা খুবই কঠিন। তবে আপনি ‘এবিসি’ নিয়ম ব্যবহার করতে পারেন। প্রথমে দেখুন ব্যক্তি বা চরিত্রটিকে— তার নড়াচড়া, ভঙ্গি কেমন। তারপর দেখুন পটভূমি— আলোর ব্যবহার ঠিক আছে কি না, আশপাশের বস্তুগুলো বাস্তবসম্মত কি না। এরপর দেখুন প্রেক্ষাপট— কী ঘটছে, সেটি কতটা যৌক্তিক। আর অবশ্যই তথ্যের উৎস যাচাই করুন।”
আরও জানতে ভিজিট করুন sbs.com.au/sbsexamines




