গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো
- সন্তান জন্মদান পরবর্তী বিষন্নতা বেবি ব্লুজের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং এর লক্ষণগুলো মারাত্মক হতে পারে।
- সন্তান জন্মদান পরবর্তী বিষন্নতা প্রতি ৫ জনের মধ্যে একজন মা এবং ১০ জনে একজন বাবাকে প্রভাবিত করে।
- এর জন্য সাইকোলজিক্যাল থেরাপি, বিষণ্ণতা রোধী ওষুধ এবং সহায়ক পরিবেশ নতুন পিতা-মাতাদের সাহায্য করতে পারে।
'অস্ট্রেলিয়া এক্সপ্লেইন্ড' বা 'অস্ট্রেলিয়া সম্পর্কে জানুন' প্রতিবেদনের এই পর্বে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যারা প্রসব-পরবর্তী বিষন্নতার সম্মুখীন হচ্ছেন তাদের সহায়তা ও চিকিৎসার জন্য অস্ট্রেলিয়ায় যেসব পরিষেবা আছে তার বিভিন্ন দিক নিয়ে।
নতুন মায়েরা সন্তান জন্মদানের পর প্রথম দিন থেকেই কথিত 'বেবি ব্লুজ'-এর সম্মুখীন হতে পারেন।
এগুলি সাধারণত হরমোনের পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট অপ্রীতিকর অনুভূতি এবং এতে মেজাজ, উদ্বেগ, কান্না এবং ঘুমের অসুবিধার মত সমস্যা থাকতে পারে। যদিও এ বিষয়গুলো চ্যালেঞ্জিং, তবে এই অনুভূতিগুলি সাধারণত চিকিৎসা ছাড়াই দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
কারো ক্ষেত্রে যদি এই লক্ষণগুলি অব্যাহত থাকে বা তার নিজের এবং নতুন শিশুর জন্য স্বাভাবিক কাজ করার ক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হয়, তবে বলা যায় তিনি প্রসব পরবর্তী বিষণ্নতার সম্মুখীন হয়েছেন।
জুলি বোর্নিনকফ একজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট এবং পেরিন্যাটাল অ্যাংজাইটি অ্যান্ড ডিপ্রেশন অস্ট্রেলিয়া (PANDA)-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, প্রসবকালীন বিষণ্নতা গর্ভাবস্থায় বা সন্তান জন্মের পর হতে পারে।
যেভাবেই হোক, জীবনের অন্য যে কোনও পর্যায়ে বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তির অভিজ্ঞতার সাথে লক্ষণগুলির বেশ মিল আছে।

যে মহিলারা আগে বিষণ্নতা অনুভব করেছেন তাদের পেরিনেটাল ডিপ্রেশন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
অন্যান্য ঝুঁকির কারণও রয়েছে, যেমন মিজ বোর্নিংখফ ব্যাখ্যা করে বলেন, যাদের বিষণ্নতার পারিবারিক ইতিহাস আছে তাদের জন্য জেনেটিক্যালি এটা ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া তাদের জীবনে উল্লেখযোগ্য ট্রমা থেকে থাকলে এই সময়ে হতাশা বা উদ্বেগ অনুভূত হতে পারে।
তিন বছর বয়সী আজাইয়ের মা সারা বারি গর্ভাবস্থায় থাকাকালে বেশ উত্তেজনা অনুভব করেছেন এবং এর জন্য নানা প্রস্তুতি।
কিন্তু তার মনে আছে কীভাবে তার প্রস্তুতি সত্ত্বেও তার ছেলের জন্মের মুহূর্তে তার ভেতর ভয় ঢুকে গিয়েছিল। এসময় অনুভূতিগুলি ছিল চ্যালেঞ্জিং যা অস্থায়ী 'বেবি ব্লুজ'-এর বাইরেও কয়েক সপ্তাহ ধরে বজায় ছিল।
জেনারেল প্র্যাকটিশনার (GP) এর সাথে পরামর্শ করার পর তার 'ক্ল্যাসিক কেস অফ পেরিনেটাল ডিপ্রেশন' ধরা পড়ে।
সারাহ বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেন এবং গত ২০ বছর ধরে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছেন।
তার ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে আসা তার বাবাই তাকে সাহায্য চাইতে উৎসাহিত করেছিলেন এবং তার বাবা-মা উভয়েই তার সংগ্রামটি বুঝতে পেরেছিলেন, তিনি বলেন।
তবে তিনি মনে করেন যে অস্ট্রেলিয়ায় প্রসবকালীন বিষণ্নতা নিয়ে স্টিগমা বা লজ্জাজনক অনুভূতি রয়েছে যদিও এটি কোনও নির্দিষ্ট জাতি বা সংস্কৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়।

মিজ সারাহ বলছেন, "আমি মনে করি না এই লজ্জার অনুভূতি শুধুমাত্র বাংলাদেশীদের বেলায় ঘটছে। আমি স্থানীয় অস্ট্রেলিয়ানদের কাছে আমার প্রসব পরবর্তী বিষণ্নতা সম্পর্কে অনেক কথা বলেছি। এবং এটি এখনও এক ধরণের লুকোচুরির বিষয়, আমি বলতে চাচ্ছি, লোকেরা কীভাবে এটি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাবে তা জানে না। এটি আসলে কৌতূহল জাগায়, আপনি জানেন, আমি একটি বিশাল কোম্পানিতে কাজ করি এবং আমি এটি সম্পর্কে আমার সহকর্মীদের সাথেও কথা বলেছি, এবং দেখা গেছে চারজনের মধ্যে অন্তত একজন জানে না যে কীভাবে এটি মোকাবেলা করতে হয়। সুতরাং, এই স্টিগমা অবশ্যই সাংস্কৃতিক বিষয়, এবং আমি মনে করি এটি আরও বিস্তৃত।"
জ্যাকি বার্নফিল্ডের মতে, পেরিনেটাল ডিপ্রেশনের ক্ষেত্রে প্রচলিত একটি মিথ হল যে এটি শুধুমাত্র মহিলাদেরকে প্রভাবিত করে।
তিনি লাইফলাইন সার্ভিস ডেলিভারির নির্বাহী পরিচালক; তার সংগঠন ক্রাইসিস সাপোর্ট সার্ভিসের মেন্সলাইনের মাধ্যমে পুরুষদের জন্যও বিশেষভাবে কাউন্সেলিং দিয়ে থাকে।

তিনি তার নিজের স্বামীর অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করে বলেন, প্রসবকালীন ডিপ্রেশন পুরুষদেরও প্রভাবিত করে। আমি মানসিক স্বাস্থ্যের নার্স ছিলাম বলে তার বিষয়ে সচেতন ছিলাম। তাই আমি মনে করি এই অভিজ্ঞতা একেক জনের কাছে একেক রকম। পেরিনেটাল ডিপ্রেশন সন্তানের বাবা-মা দুজনকেই প্রভাবিত করে।
ধারণা করা হয় যে প্রতি দশ জনের মধ্যে একজন পুরুষ পেরিনেটাল ডিপ্রেশনের অভিজ্ঞতা পেয়ে থাকেন।
ড. বার্নফিল্ড বলেন, নারীদের মধ্যে এটি ঘটার হার বেশি হলেও, পুরুষদের বেলায়ও লক্ষণগুলো একই।
দম্পতিদের জন্য যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারো পার্টনার সন্তান জন্ম পরবর্তী বিষণ্নতার মধ্য দিয়ে গেলে তাকে সহায়তা করতে পুরুষ পার্টনারদের জন্য ডঃ বার্নফিল্ড নির্দিষ্ট কিছু পরামর্শ প্রদান করেন।
যেমন সন্তানের মায়ের কেমন লাগছে তা জানা, নিজের অনুভূতি প্রকাশ, কোন বিষয় অস্পষ্টতা থাকলে বা শংকা থাকলে কথা বলে একসাথে তার সমাধানের চেষ্টা করা।

প্রসবোত্তর বিষণ্নতার চিকিত্সা সম্ভব। ডাক্তার আপনার প্রয়োজনগুলি মূল্যায়ন করবে এবং আপনার জন্য উপযুক্ত চিকিত্সার সুপারিশ করবে।
অভিজ্ঞতা থেকে কথা বলতে গিয়ে, সারাহ বলেন যে নতুন মায়েদের জন্য টানেলের শেষে যে আলো আছে তা জানা গুরুত্বপূর্ণ।
তার চিকিত্সার জন্য এন্টিডিপ্রেসেন্ট ঔষধ দেয়া হয়েছিল। তার বিষন্নতা-মুক্তির প্রক্রিয়াটি নথিভুক্ত হলে, তিনি বলেন যে এই চিকিত্সা তার মন-মেজাজে বাস্তব উন্নতি এনেছিল।
সারাহ নতুন বাবা-মাদেরকে যে এক নম্বর উপদেশটি দেন তা হলো প্রতিদিন মানসিক স্বাস্থ্য নিরীক্ষণ।
পান্ডার (PANDA) মিজ বোর্নিনকফও এ বিষয়ে একমত।
হেল্পলাইনে কলকারীদের তিনি বলে থাকেন যে প্রসবকালীন বিষণ্নতায় ভোগার সম্ভাবনার জন্য প্রস্তুতি ততটাই গুরুত্বপূর্ণ যতটা গুরুত্বপূর্ণ যখন এটি ঘটে এবং সহায়তা পেতে চান।
সাহায্য পেতে যোগাযোগ করুনঃ
- পেরিনেটাল অ্যাংজাইটি এবং ডিপ্রেশনে সাহায্যের জন্য, পান্ডা (PANDA) বা (Perinatal Anxiety & Depression Australia)-তে 1300 726 306 নম্বরে কল করুন অথবা panda.org.au দেখুন।
- প্রতিদিন ২৪ ঘন্টাই মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা পেতে কল করুন Beyond Blue-তে 1300 224 636 নম্বরে অথবা beyondblue.org.au দেখুন।
- প্রতিদিন ২৪ ঘন্টা সংকটকালীন সহায়তার জন্য 13 11 14 নম্বরে লাইফলাইনে কল করুন।
- আপনার ভাষায় সহায়তার জন্য, এম্ব্রেস মাল্টিকালচারাল মেন্টাল হেলথ দেখুন যারা সাংস্কৃতিক এবং ভাষাগতভাবে বিভিন্ন পটভূমির লোকদের সহায়তা করে।
পুরো প্রতিবেদনটি শুনতে উপরের অডিও প্লেয়ারে ক্লিক করুন।
এসবিএস রেডিও সম্প্রচার-সূচী হালনাগাদ করেছে, এখন থেকে প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার, বিকাল ৩টায়, এসবিএস সাউথ এশিয়ান-এ আমাদের অনুষ্ঠান শুনুন, লাইভ।
কিংবা, পুরনো সময়সূচীতেও আপনি আমাদের অনুষ্ঠান শোনা চালিয়ে যেতে পারেন। প্রতি সোম ও শনিবার, সন্ধ্যা ৬টায়, এসবিএস-২ এ।
রেডিও অনুষ্ঠান পরেও শুনতে পারবেন, ভিজিট করুন: এসবিএস বাংলা।









