বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে গত ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বৃহস্পতিবার। এতে বিজয়ী হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বিএনপি। এই নির্বাচন নিয়ে এখন আমরা কথা বলছি গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটির গ্রিফিথ বিজনেস স্কুলের প্রফেসর ড. রেজা মোনেমের সঙ্গে। [মিউজিক]
সিকদার তাহের আহমদ: ড. রেজা মোনেম, এসবিএস বাংলায় আপনাকে স্বাগত।
ড. রেজা মোনেম: ধন্যবাদ! এসবিএস বাংলা শ্রোতাদেরকে আমার শুভেচ্ছা।
সিকদার তাহের আহমদ: বাংলাদেশে কেমন হলো এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট?
ড. রেজা মোনেম: বারোই ফেব্রুয়ারিতে দুটো ঘটনা ঘটে গেল। একটা হচ্ছে, প্রথমবারের মতো গণভোট হলো যে, বাংলাদেশের সংবিধান সংস্কার করা হবে কিনা? প্রথমেই যদি বলতে হয় গণভোটে হ্যাঁ, অর্থাৎ সংস্কার করতে হবে। এই হ্যাঁ এর পক্ষে ভোট পড়েছে চার কোটি একাশি লক্ষ, আর না এর পক্ষে ভোট পড়েছে প্রায় দুই কোটি একুশ লক্ষের মতো। কাজেই হ্যাঁ ভোট জয়ী হয়েছে। তার মানে যারা সরকার গঠন করবেন এবং সংসদে বসবেন, একশো আশি দিনের মধ্যে এই সংসদকে ওই প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো কার্যকর করতে হবে। অন্যতম একটা সংস্কার প্রস্তাব হচ্ছে যে, বাংলাদেশে এতদিন কোন উচ্চকক্ষ ছিল না, এখন উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। উচ্চকক্ষের আসন সংখ্যা হবে একশ। এর মধ্যে শোনা যাচ্ছে যে, ভোটের অনুপাতে বিএনপি পাবে ছয়চল্লিশটা আসন, আর জামাত পাবে চুয়াল্লিশটা আসন। কাজেই উচ্চকক্ষ যেহেতু একটা ভারসাম্য বজায় রাখবে নিম্ন কক্ষের সাথে এবং দেখা যাচ্ছে এই সংখ্যার দিক থেকে জামায়াতে ইসলামী একটি শক্তিশালী বিরোধী দল হবে। আর ভোটের কথা যদি বলতে হয়, নির্বাচনের কথা যদি বলতে হয় তাহলে নির্বাচন, এবারের নির্বাচন গত তিনটি নির্বাচনের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর হয়েছে, এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ গত তিনটি নির্বাচন ছিল একতরফা। এখানে ভোটার উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে উনষাট দশমিক চার চার শতাংশ। এর মধ্যে বিএনপি সমর্থিত জোট পেয়েছে দুইশত বারোটি এবং জামাত সমর্থিত এগারো দলীয় ঐক্যজোট পেয়েছে সাতাত্তরটি আসন, আর স্বতন্ত্ররা পেয়েছেন আটটি আসন। আর তিনটি আসনের ফলাফল স্থগিত আছে বা ফলাফল ঘোষণা করা হচ্ছে না। যেহেতু চট্টগ্রাম দুই, চট্টগ্রাম চার এবং শেরপুর-তিন এ প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে সেখানে কোন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। তো নির্বাচন দিন তেমন একটা সহিংসতা হয়নি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, দুঃখজনকভাবে নির্বাচন পরবর্তী গত কয়েকদিনে বেশ কিছু সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
সিকদার তাহের আহমদ: বাংলাদেশের ধর্মভিত্তিক রাজনীতির এই উত্থানের কারণ কি?
ড. রেজা মোনেম: দেখুন, এ এটি একটি জটিল প্রশ্ন। এটার উত্তর দিতে গেলে একটু সময় দরকার। যদি খুব সংক্ষেপে বলতে হয় কয়েকটা জিনিস, একটা হচ্ছে যে পাকিস্তান আমলে ধর্ম ছিল অনেকটা ব্যক্তি পর্যায়ে। মানুষ রোজা রাখত, নামাজ পড়ত, ওয়াজ মাহফিল হতো, এসব অনুষ্ঠান ছিল। বাট এত ব্যাপক হারে ছিল না। আপনি মনে করেন সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমান দেশগুলোতে শ্রমবাজারে শ্রমিক রপ্তানি শুরু করে এবং এটাকে আপনি বলতে পারেন পেট্রো ডলার বা গ্লোবালাইজেশনের ফলাফল। আগে যেহেতু আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা সীমিত ছিল, ধর্মটা ছিল দেশ কেন্দ্রিক। এখন ধর্মটা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চলে গেছে। যারা বিদেশে যাচ্ছেন, গিয়ে ইসলামের নতুন চর্চা দেখে আসছেন। ওখানে মানুষ কি করে, কি না করে, ইসলামী পোশাক, খাবার দাবার এসব সাংস্কৃতিক পরিবর্তন হয়েছে। তো এটা একটা সামাজিক পরিবর্তন, সময়ের প্রেক্ষাপটে। আরেকটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়, বাংলাদেশে তখন জনসংখ্যা ছিল ষাট কোটি। এখন বাংলাদেশের জনসংখ্যা আঠারো কোটি। এই বিপুল জনসংখ্যার বৃদ্ধি, এর সাথে তাল মিলিয়ে সেক্যুলার এডুকেশন সিস্টেম গড়ে ওঠেনি। যেমন আমরা যেটা বলি মেইনস্ট্রিম স্কুল কলেজ এসব তেমন একটা গড়ে ওঠেনি। পক্ষান্তরে প্রচুর মাদ্রাসা হয়েছে। এখন মাদ্রাসা হওয়ার কারণ কি? মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা অনেক ধর্মপ্রাণ মুসলমান একটা সওয়াবের কাজ বা জনকল্যাণমূলক কাজ হিসেবে দেখেন এবং এরকম শোনা যাচ্ছে যে, হাসপাতালে মানুষ অনুদান দিতে রাজি না কিন্তু মাদ্রাসাতে দিবে। কারণ পরকালের জন্য মানুষ কাজ করবে। আর এই, এর ফলে আপনার পাড়ায়, মহল্লায়, গ্রামেগঞ্জে প্রচুর মাদ্রাসা গুজে উঠেছে, যেগুলা নাকি কওমি মাদ্রাসা এবং কারা এখানে পড়ে? নিম্নবিত্ত এবং অসহায় গরিব দুঃখী মানুষের ছেলেমেয়েরা এইসব মাদ্রাসায় বিনামূল্যে পড়তে পারে এবং তাদের থাকা খাওয়ারও একটা ব্যবস্থা করা হয়। এর সাথে আমরা দেখেছি এই চব্বিশের যে গণঅভ্যুত্থান, এই গণঅভ্যুত্থানে মাদ্রাসার ছাত্ররা বিরাট একটা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। যাত্রাবাড়ী সুনির আখরায় মাদ্রাসার ছাত্ররা পুলিশ এর বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তোলে যেটা এবং তো স্বাভাবতই ফ্যাসিবাদ বিরোধীদের আন্দোলন ছিল। সেই আন্দোলনে মাদ্রাসার একটা অগ্রণী ভূমিকা ছিল। এতে মানুষের, যারা ইসলামী দলগুলোর প্রতি মানুষের একটা সহানুভূতি তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ যে জিনিসটা বলতে হয় সেটা হচ্ছে যে, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ যেমন ধরেন কুলি, মজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, স্ট্রিট হকার। সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা যায় অনেকে বলতে শোনা যায়, আমরা বিএনপির শাসন আমল দেখেছি, আওয়ামী লীগের শাসন আমল দেখেছি। জামাতকে একটা সুযোগ দেওয়া দরকার। আমার মনে হয় এটাও একটা অন্যতম বড় কারণ জামায়াত, জামাতের এত সিট পাওয়ার পিছনে।
সিকদার তাহের আহমদ: আসন্ন রমজান মাসে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সামনে কি কোন চ্যালেঞ্জ দেখা দিবে?
ড. রেজা মোনেম: দেখুন, প্রত্যেক বছর যখন রোজা আসে তখন বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্যের
লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়। তো সরকারের জন্য আশু যেই চ্যালেঞ্জটা হবে সেটা হবে, এই রোজার আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। এর রোজার মধ্যে জিনিসপত্রের দাম মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা এটা হবে সরকারের ইমিডিয়েট চ্যালেঞ্জ। এরপরে রোজা পরবর্তী সময়ে সরকারের প্রতি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে যে, অর্থনীতি অনেকটা স্লথ হয়ে যাচ্ছে, অর্থনীতি চাঙ্গা করা। গতকালকে খবরে দেখলাম যে, রপ্তানি আয় কমে যাচ্ছে। রপ্তানি আয় কমে গেলে আমাদের ডলার রিজার্ভের উপরে একটা চাপ পড়বে এবং আপনি জানেন সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিক ইউনিয়ন বেশ আন্দোলন করছে, যে চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের কাছে তুলে দেওয়া হয়েছে, এটা তারা চায় না। এখানে যদি চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসের, পণ্য খালাসের ব্যাপারে সমস্যা হয় তাহলে এটা বাজারে প্রভাব বিস্তার করবে। সরকারের জন্য রোজার পরে যে চ্যালেঞ্জ হবে সেটা হচ্ছে যে, বাইরে বিপুল পরিমাণ যে টাকা পাচার হয়েছে সে টাকা উদ্ধারের ব্যবস্থা করা, অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা এবং রিজার্ভের মজুতকে শক্ত রাখা।
সিকদার তাহের আহমদ: ড. রেজা মোনেম, এসবিএস বাংলাকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
ড. রেজা মোনেম: এসবিএস বাংলাকেও আমার ধন্যবাদ।
END OF TRANSCRIPT