গুরুত্বপূর্ণ দিক
- গত বছর প্রেমঘটিত প্রতারণায় অস্ট্রেলীয়দের ক্ষতি হয়েছে ২৩ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি, এবং প্রতারকরা এখন আরও বেশি কৌশলী পদ্ধতিতে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।
- যদিও প্রবীণ ব্যক্তি, বিধবা, বিবাহবিচ্ছিন্ন, অভিবাসী ও আদিবাসীরা প্রায়ই লক্ষ্যবস্তু হন, আসলে অনলাইনে প্রেম খোঁজা যেকোনো মানুষই এর শিকার হতে পারেন।
- প্রতারকরা খুব দ্রুত বিশ্বাস অর্জন করে এবং আবেগ নিয়ে খেলা ক’রে অর্থ বা ব্যক্তিগত তথ্য চেয়ে বসে।
- কিছু ব্যাপারে সতর্ক থাকুন, যেমন সামনা-সামনি দেখা করতে না চাওয়া, সম্পর্ক গোপন রাখতে জোর দেওয়া এবং অর্থ চাওয়া—এসব বিষয়ে সতর্ক থাকলে আপনি ও আপনার প্রিয়জনরা এ ধরনের প্রতারণা থেকে রক্ষা পেতে পারেন।
বিবাহ বিচ্ছেদের ২৫ বছর পর যখন কাইলি ডেনিসের মা জানালেন যে তিনি কারো সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন, তখন কাইলি বেশ উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন।
কিন্তু সাবেক পুলিশ অফিসার কাইলির মনে সন্দেহ জাগে যখন তাঁর মা জানান, ছয় মাস ধরে ওই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বললেও এখনো তাদের সামনাসামনি দেখা হয়নি।
তারপর মা বললেন, ‘ও এখন তুরস্কে, একটা পাইপলাইনের চুক্তি চূড়ান্ত করছে’। শুনে মনে হয়েছিল যুক্তিযুক্ত একটা কথা। কিন্তু যখন বললেন, ‘আমরা ছয় মাস ধরে কথা বলছি’, তখনই আমার সন্দেহ হলো।
তাঁর মা যখন ওই ব্যক্তির ছবি পাঠালেন, তখন কাইলি অনুসন্ধান করতে শুরু করেন।

সেই ছবির রিভার্স ইমেজ সার্চ করে তিনি জানতে পারেন, ছবিগুলো আদৌ অস্ট্রেলীয় কোনো ব্যক্তির নয় যাঁর সঙ্গে তাঁর মা প্রেম করছেন।
তিনি বলেন, “আমি খুঁজে পাই যে ছবিগুলোর মালিক একজন আমেরিকান রিয়েল এস্টেট এজেন্ট। তাঁর স্ত্রী, মেয়ে, এমনকি নাতিও আছে। তিনি তুরস্কে ছিলেন না, অস্ট্রেলীয়ও নন, তাঁর স্ত্রী অরেঞ্জে মারা যাননি। সবকিছু মিলিয়ে আমি মাকে বোঝাতে শুরু করি, তাঁকে এই কঠিন সত্যিটা বলতে হয়। "
আমার পেশাগত অভিজ্ঞতা থেকে তাঁকে দৃঢ়ভাবে, তবে মমতার সুরে বলেছিলাম—‘মা, তুমি একটা স্ক্যামের শিকার হয়েছ’।
কাইলির মা দাবি করেন, তিনি প্রতারককে কোনো টাকা পাঠাননি। কিন্তু কাইলি ডেনিস ধারণা করেন, তাঁর মা সম্ভবত টাকা পাঠিয়েছেন, শুধু লজ্জায় সেটা স্বীকার করতে পারছেন না।

এই অভিজ্ঞতা থেকেই কাইলি শুরু করেন টু ফেস ইনভেস্টিগেশনস—যেটি একটি বিশেষায়িত সেবা, যার লক্ষ্য হলো প্রেমঘটিত প্রতারণার মুখোশ খুলে দেওয়া।
তিনি জানান, প্রায় সব রোমান্স স্ক্যামই শুরু হয় ডেটিং অ্যাপ বা ফেসবুকের মতো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে এবং সেগুলোর ধরন প্রায় একই রকম।
“আপনি অনলাইনে গেলেন, নিজের মতো একজন আদর্শ সঙ্গী খুঁজে পেলেন, আর সম্পর্কটা খুব দ্রুত গড়ে ওঠে। প্রতারক তখন আপনাকে ডেটিং অ্যাপ থেকে বার করে মেসেজিং প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসে। তারপর ঘনিষ্ঠ আলাপ শুরু হয়। তারা বোঝার চেষ্টা করে আপনার মূল্যবোধ কী, আপনি কী পছন্দ করেন, কী অপছন্দ করেন। সম্পর্কটা খুব দ্রুত গাঢ় হয়, আর কিছুদিনের মধ্যেই কোনো জরুরি পরিস্থিতির অজুহাতে তারা আর্থিক সাহায্য চাইতে শুরু করে।”
ন্যাশনাল অ্যান্টি-স্ক্যাম সেন্টার পরিচালনা করে থাকে অস্ট্রেলিয়ান কম্পিটিশন অ্যান্ড কনজিউমার কমিশন বা ACCC। তাদের ডেপুটি চেয়ার ক্যাটরিনা লো বলেন—কিছু প্রতারণার ঘটনা খুব দ্রুত ঘটে, আবার অনেক ক্ষেত্রে স্ক্যামাররা অনেক লম্বা সময় নিয়ে প্রতারণা ঘটায়।

অনলাইনে ডেটিং এর ক্ষেত্রে কিছু লক্ষণ রয়েছে, যা প্রেমঘটিত প্রতারণার ইঙ্গিত দিতে পারে।
যেমন, ‘লাভ বম্বিং’। এ ব্যাপারে সতর্ক করে দেন ক্যাটরিনা লো।
তিনি বলেন, “এটা এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে প্রতারক শুরু থেকেই দিনে বহুবার যোগাযোগ করে। খুব তাড়াতাড়ি ভালোবাসা বা গভীর টান প্রকাশ করে, যেন শিকারকে একেবারে অভিভূত করে ফেলতে পারে।”
একবার সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেলে, প্রতারকরা সাধারণত ডেটিং অ্যাপ থেকে কথাবার্তা সরিয়ে নিয়ে যায় এনক্রিপটেড প্ল্যাটফর্মে—যেমন WhatsApp কিংবা ইমেইলে—যেগুলো ট্র্যাক করা কঠিন।
কাইলি ডেনিসের মতে, সবচেয়ে বড় সতর্ক সংকেত হলো—কেউ যদি ব্যক্তিগতভাবে দেখা করার বিষয়টা এড়িয়ে চলে।
ড. ঋতেশ চুঘ, যিনি সেন্ট্রাল কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটির অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর এবং সামাজিক-প্রযুক্তি বিশ্লেষক। তিনি বলেন—প্রেমঘটিত প্রতারণার সবচেয়ে বড় লক্ষণ হলো এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করা যেখানে হঠাৎ করে তার জরুরী অর্থ সহায়তার প্রয়োজন হয়।
কাইলি ডেনিস বলেন,
প্রতারকরা প্রায়ই তাদের শিকারকে নিঃসঙ্গ করে ফেলে, এবং সম্পর্ক নিয়ে গোপনীয়তা বজায় রাখতে বাধ্য করার চেষ্টা করে।
ড. ঋতেশ চুঘ সতর্ক করে দেন, প্রতারকরা এখন ভুয়া বিনিয়োগের সুযোগ দেখিয়েও টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, যেগুলোর মধ্যে ক্রিপ্টোকারেন্সি অন্যতম।
প্রতারকরা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI ব্যবহার করে খুবই বাস্তবসম্মত ছবি ও ভিডিও বানাচ্ছে। তাই, শুধু ভিডিও কল করলেই কারও পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।

ন্যাশনাল অ্যান্টি-স্ক্যাম সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ৫৫ বছরের বেশি বয়সীদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।
ড. চুঘ বলেন, প্রবীণ নাগরিক, বিধবা, বিবাহবিচ্ছিন্ন, আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ এবং শারীরিক প্রতিবন্ধীরা প্রায়ই লক্ষ্যবস্তু হলেও, আসলে যে কেউ এই প্রতারণার শিকার হতে পারে।
তিনি আরও জানান, অভিবাসীরাও নানা কারণে এই প্রতারণার সহজ শিকার হয়ে ওঠেন।
যদি সন্দেহ হয় যে আপনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন, তাহলে দ্রুত আপনার ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন যেন ভবিষ্যতের লেনদেন বন্ধ করা যায়, এবং আপনার অনলাইন পাসওয়ার্ডগুলো পরিবর্তন করে ফেলুন।
সহায়তার জন্য যোগাযোগ করতে পারেন IDCARE-এর সঙ্গে এবং প্রতারণার রিপোর্ট করতে পারেন Scam Watch-এ, যা ন্যাশনাল অ্যান্টি-স্ক্যাম সেন্টার দ্বারা পরিচালিত।
ড. ঋতেশ চুঘ বলেন,
রোমান্স স্ক্যামে প্রতারণা ঠেকাতে এসব ঘটনা রিপোর্ট করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ-সম্পর্কে আরও তথ্য জানতে বা প্রতারণার ঘটনা রিপোর্ট করতে ভিজিট করুন: scamwatch.gov.au
সম্পূর্ণ প্রতিবেদনটি শুনতে উপরের অডিও-প্লেয়ারে ক্লিক করুন।
অস্ট্রেলিয়ায় আপনার নতুন জীবনে স্থায়ী হওয়ার বিষয়ে আরও মূল্যবান তথ্য এবং টিপসের জন্য ‘অস্ট্রেলিয়া সম্পর্কে জানুন’ পডকাস্ট অনুসরণ করুন।
আপনার কোনো প্রশ্ন বা নতুন কোনো বিষয় নিয়ে আমাদের পডকাস্টে শুনতে চাইলে australiaexplained@sbs.com.au -এ আমাদের ইমেল করুন।








