গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো
- ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে 'টেরা নালিয়াস' এর ঘোষণাটিকে আইনগতভাবে চ্যালেঞ্জ করা হয় এবং এই দাবিকে ভুল ঘোষণা করার পরেই কেবল এই যুদ্ধগুলিকে স্বীকার করে নেয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
- ১৭৮৮ সালে প্রথম নৌবহরের আগমন থেকে শুরু করে ১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত পুরো মহাদেশ জুড়ে এই যুদ্ধ ও সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছিল।
- ১৮২৪ থেকে ১৮৩১ সালের ভেতর সংঘটিত হওয়া টাসমানিয়ার ব্ল্যাক ওয়ার বা কালো যুদ্ধ, অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে তীব্র সীমান্ত সংঘাত ছিল।
সতর্কতামূলক ঘোষণা: এই প্রতিবেদনে সহিংসতার উল্লেখ রয়েছে যা অনেক শ্রোতা এবং পাঠকদের জন্যে অনুপযোগী হতে পারে।
এখন যে মহাদেশটি অস্ট্রেলিয়া নামে পরিচিত, বহু বছর আগে ক্যাপ্টেন জেমস কুক প্রথম যখন তার তীরে এসে পৌঁছান, তখন তিনি এই বিশাল ভূখন্ডের নাম দিয়েছিলেন ‘টেরা নালিয়াস’, যার অর্থ হচ্ছে এমন একটি ভূমি যা কারও অধিকৃত নয়।
প্রকৃতপক্ষে, এই দ্বীপ মহাদেশটি শত শত আদিবাসী এবং টরে' স্ট্রেইট আইল্যান্ডার মানুষদের দেশ ছিল।
সেই হাজার লক্ষ আদিবাসী মানুষ যারা এখানে বাস করত তারা তাত্ক্ষণিকভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ‘সাবজেক্ট’ হিসেবে পরিগণিত হয়।
এই ব্যাপারটিই ফ্রন্টিয়ার যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়। এর মাধ্যমে ইন্ডেজেনাস বা আদিবাসী জনগণ এবং বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়, যা আসলে আধুনিক অস্ট্রেলিয়ার ভিত্তি। তবে এই নিষ্ঠুরতার ইতিহাস কেবল সম্প্রতি স্বীকৃতি পেতে শুরু করেছে।
দ্য অস্ট্রেলিয়ান ওয়ারস-এর ট্রেলার দেখুনঃ
চলচ্চিত্র নির্মাতা র্যাচেল পারকিনস একজন অ্যারান্ডা ও কালকাদুন নারী, সেই সাথে তাঁর ইউরোপীয় ঐতিহ্যও রয়েছে।
২০২২ সালে তিনি একটি ডকুমেন্টারি সিরিজ প্রকাশ করেছেন যা ব্রিটিশ বসতি স্থাপনকারীদের কাছ থেকে নিজেদের ভূমি রক্ষা করার জন্যে আদিবাসীদের সংগ্রামের ঘটনার বিবরণ সামনে তুলে এনেছে।
১৭৮৮ সালে প্রথম নৌবহরের আগমন থেকে শুরু করে ১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত পুরো মহাদেশ জুড়ে এই যুদ্ধ ও সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছিল, কিন্তু এই ঘটনাগুলো কোনও স্কুলে পড়ানো হতো না, এমনকি বিংশ শতকের শেষ পর্যন্তও যুদ্ধ হিসাবে স্বীকৃত ছিল না।
অধ্যাপক হেনরি রেনল্ডস অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে সম্মানিত ইতিহাসবিদদের একজন এবং যুদ্ধ-বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ। ১৯৬৬ সালে তিনি যখন ইতিহাস পড়ানো শুরু করেন, তখন ইতিহাসের বইয়ে আদিবাসী মানুষদের উল্লেখ প্রায় ছিল না বললেই চলে।
‘কারণ এগুলো ছিল গেরিলা যুদ্ধ,’ প্রফেসর রেনল্ডস বলেন।
ইতিহাসবিদ ড. নিকোলাস ক্লেমেন্টস, যিনি অস্ট্রেলিয়ান ফ্রন্টিয়ার ওয়ার্সের আরেকজন বিশেষজ্ঞ, তিনিও একমত পোষণ করেন।
এই রাজনৈতিক কারণগুলি টেরা নালিয়াস এবং ব্রিটিশ আইনের ধারণায় ফিরে আসে, যেমনটি র্যাচেল পারকিনস তাঁর ডকুমেন্টারি সিরিজে ব্যাখ্যা করেছেন।
মাবো এবং 'টেরা নালিয়াস' এর ঘোষণার বিলোপ
১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে 'টেরা নালিয়াস' এর ঘোষণাটিকে আইনগতভাবে চ্যালেঞ্জ করা হয় এবং এই দাবিকে ভুল ঘোষণা করার পরেই কেবল এই যুদ্ধগুলিকে স্বীকার করে নেয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তকে মাবো সিদ্ধান্ত বলা হয়ে থাকে।
অস্ট্রেলিয়ায় ভূমির আদিবাসী মালিকানাকে স্বীকৃতি দিতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ব্যর্থতা একটি ঐতিহাসিক ভুল।ড. নিকোলাস ক্লেমেন্টস, ইতিহাসবিদ

ড. ক্লেমেন্টস বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় ভূমির আদিবাসী মালিকানাকে স্বীকৃতি দিতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ব্যর্থতা একটি ঐতিহাসিক ভুল।
আর সেই ব্যর্থতাই নির্মম রক্তপাতের দিকে সবাইকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
ঔপনিবেশিক পরিসংখ্যান এবং বিশেষজ্ঞদের দল দ্বারা উদ্ঘাটিত প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণগুলিই সেই সংঘাতের ভয়াবহ মাত্রা প্রদর্শন করে।
যারা বেঁচে গেছেন তাদের বংশধররা এসব ঘটনা সব সময় মনে রাখবেন।র্যাচেল পারকিনস, চলচ্চিত্র নির্মাতা
শুধুমাত্র অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল মিউজিয়ামের সংগ্রহশালাতেই আদিবাসী পূর্বপুরুষদের ৪০০ টিরও বেশি দেহাবশেষ রয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগই মৃত্যুদণ্ড, হত্যা এবং গণহত্যার মাধ্যমে তাঁদের মৃত্যুর প্রমাণ।
র্যাচেল পারকিনস বলেন, যারা বেঁচে গেছেন তাদের বংশধররা এসব ঘটনা সব সময় মনে রাখবেন।
দ্য ব্ল্যাক ওয়ার
১৮২৪ থেকে ১৮৩১ সালের ভেতর সংঘটিত হওয়া টাসমানিয়ার ব্ল্যাক ওয়ার বা কালো যুদ্ধ, অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে তীব্র সীমান্ত সংঘাত ছিল।
ড. ক্লেমেন্টস বলেন, দ্য ব্ল্যাক ওয়ার নামে পরিচিতি পাওয়া যুদ্ধটি অস্ট্রেলিয়ায় ভৌগোলিকভাবে সবচেয়ে সীমাবদ্ধ এবং অস্ট্রেলিয়ার অন্যান্য সংঘাতের তুলনায় সবচেয়ে কম সময় স্থায়ী হয়েছিল।
দি অস্ট্রেলিয়ান ওয়ার সিরিজটিতে র্যাচেল পারকিনস দেখান যে ব্ল্যাক ওয়ারে যত টাসমানিয়ান মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, সেটি কোরিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম এবং অন্যান্য শান্তিরক্ষা মিশনগুলিতে মারা যাওয়া মানুষদের সর্বমোট সংখ্যার চেয়েও অনেক বেশি।
ড. নিকোলাস ক্লেমেন্টস বলেন, ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ ও বসতি স্থাপনকারীরা আদিবাসীদের সাংঘাতিক ভয় পেত।

কিন্তু শেষমেশ ইউরোপীয়দেরই জয় হয়। তারা আদিবাসী টাসমানিয়ানদের প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল
এই সহিংসতার বেশিরভাগই ছিল যৌন সহিংসতা। আদিবাসী নারীদের অপহরণ ও ধর্ষণ এতটাই সাধারণ ও নিয়মিত ঘটনা ছিল যে, কিছু কিছু ইতিহাসবিদেরা বিশেষ কয়েকটি আদিবাসী জাতির টিকে থাকার বর্ণনার সাথে সেই যৌণ নিপীড়নের ঘটনাগুলোও উল্লেখ করেন।
আগুন নিয়ে যুদ্ধ
অস্ট্রেলিয়ার অনেক এলাকায় আদিবাসী প্রতিরোধকে ভেঙে দেয়ার জন্য, ঔপনিবেশিকরা স্থানীয় বা নেটিভ পুলিশ তৈরি করেছিল। তারা ছিল একটি প্রশিক্ষিত আধাসামরিক বাহিনী, যাদের মূলত সন্ত্রাস সৃষ্টি করতে ব্যবহার করা হত।
অধ্যাপক রেনল্ডস ব্যাখ্যা করে বলেন, এই বাহিনীর পুরুষদের নির্দিষ্ট পোশাক পরতে হতো, তাদেরকে বন্দুক এবং ঘোড়া দেওয়া হয়েছিল।
দি অস্ট্রেলিয়ান ওয়ার্স ডকুমেন্টারি সিরিজ তৈরির সময় র্যাচেল পারকিনসকে এই সমস্ত ইতিহাসের মুখোমুখি হতে হয়।

কেন এই ইতিহাস স্মরণ করা হয় না?
ড. ক্লেমেন্টস, যার পূর্বসূরিরা আদতে বসতি স্থাপনকারী ছিলেন, তিনি বিশ্বাস করেন যে সমস্ত অস্ট্রেলিয়ানদের এই ইতিহাস সংক্রান্ত লজ্জা কাটিয়ে উঠতে হবে এবং অতীতের অন্যায় ও অবিচারের উপর আলোকপাত করতে হবে।

পুরো প্রতিবেদনটি শুনতে উপরের অডিও প্লেয়ারে ক্লিক করুন।
অস্ট্রেলিয়ান ওয়ার্স এসবিএস অন ডিমান্ডে পাঁচটি ভাষায় দেখা যাচ্ছে। যেগুলো হচ্ছেঃ সরলীকৃত চীনা, আরবি, ঐতিহ্যবাহী চীনা, ভিয়েতনামী এবং কোরিয়ান ভাষা। সিরিজটি অন্ধ বা দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী শ্রোতারাও অডিও বর্ণনা/সাবটাইটেল সহ শুনতে পাবেন।
এই প্রতিবেদনটি ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।
এসবিএস রেডিও সম্প্রচার-সূচী হালনাগাদ করেছে, এখন থেকে প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার, বিকাল ৩টায়, এসবিএস সাউথ এশিয়ান-এ আমাদের অনুষ্ঠান শুনুন, লাইভ।
কিংবা, পুরনো সময়সূচীতেও আপনি আমাদের অনুষ্ঠান শোনা চালিয়ে যেতে পারেন। প্রতি সোম ও শনিবার, সন্ধ্যা ৬টায়, এসবিএস-২ এ।
রেডিও অনুষ্ঠান পরেও শুনতে পারবেন, ভিজিট করুন: এসবিএস বাংলা।










