অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে একটি অন্ধকার অধ্যায় রয়েছে, যা সম্পর্কে এখনো অনেকেরই জানা বাকি রয়েছে। ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপনের পর, অ্যাবরিজিনাল ও টরে স্ট্রেইট আইল্যান্ডার জনগোষ্ঠীর শিশুদের তাদের পরিবার থেকে পরিকল্পিতভাবে আলাদা করা হয়েছিল এবং তাদের জোরপূর্বক নন-ইন্ডিজেনাস সমাজে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তারা যে ট্রমা ও নির্যাতনের ভেতর দিয়ে গেছে, তা তাদের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। এই বেদনা আজও অনুভব করা যায়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যার প্রতিধ্বনি শোনা যায়। তবে, এখন অনেক কমিউনিটি এর ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে কাজ করছে। বর্তমানে এই মানুষদের "স্টোলেন জেনারেশনস"-এর বেঁচে থাকা সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
মূল বিষয়
- হাজার হাজার আদিবাসী শিশুকে জোরপূর্বক তাদের পরিবার থেকে আলাদা করে শ্বেতাঙ্গ সমাজে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
- এই অপসারণের ফলে যে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী ট্রমা তৈরি হয়েছিল, তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ছড়িয়ে পড়েছে।
- বিভিন্ন সম্প্রদায় এখন সংস্কৃতির সঙ্গে পুনঃসংযোগ এবং সহায়তামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে নিরাময়ের পথ বেছে নিচ্ছে।
- নিরাময়ের জন্য শিক্ষা এবং জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শুরুর আগে একটি সতর্কবার্তা: এই পর্বে কিছু বেদনাদায়ক বিষয় রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ট্রমা, শিশু অপসারণের প্রসঙ্গ এবং অ্যাবরিজিনাল ও টরে স্ট্রেইট আইল্যান্ডার জনগোষ্ঠীর প্রয়াত ব্যক্তিদের উল্লেখ। পডকাস্টটি শোনার সময় অনুগ্রহ করে সতর্ক থাকুন।
১৯১০ সাল থেকে শুরু করে ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত, হাজার হাজার অ্যাবরিজিনাল ও টরে স্ট্রেইট আইল্যান্ডার জনগোষ্ঠীর শিশুকে জোরপূর্বক তাদের পরিবার, সম্প্রদায় এবং কান্ট্রি থেকে আলাদা করে দেওয়া হয়েছিল।
সেই সময়কার সরকারি নীতিমালার অধীনে, এই শিশুদেরকে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা নন-ইন্ডিজেনাস পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হতো, প্রায়শই গির্জা, সমাজকল্যাণ সংস্থা এবং সরকারি দপ্তরগুলোর মাধ্যমে।
তখন দাবি করা হতো যে, ফার্স্ট নেশনস শিশুদের যদি শ্বেতাঙ্গ সমাজে লালন-পালন করা হয়, তবে তারা “উন্নত জীবন" পাবে।
শিশুদেরকে উদ্দেশ্যমূলকভাবেই আলাদা করা হতো, কারণ তাদের শেখানো সহজ এবং নিজস্ব সংস্কৃতিকে অস্বীকার করার ব্যাপারে তাদের জোর করা যেতো।
শ্যানন ডডসন একজন ইয়াওরু নারী (ব্রুম অঞ্চলের অধিবাসী) এবং হিলিং ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। এটি একটি জাতীয় অ্যাবরিজিনাল ও টরে স্ট্রেইট আইল্যান্ডার সংস্থা, যারা জোরপূর্বক অপসারণজনিত ট্রমা মোকাবেলায় কাজ করে।
তিনি বলেন, “আমরা এমন গল্প শুনেছি যেখানে পরিবারের সদস্যদের বলা হতো যে তাদের কেউ মারা গেছে, অথবা শিশুদের বলা হতো যে তাদের পরিবার তাদের আর চায় না। এটা ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক এক সময়, যা বহু অ্যাবরিজিনাল ও টরে স্ট্রেইট আইল্যান্ডার পরিবারের সাথে দশকের পর দশক ধরে চলেছে।”

সীমিত এবং অসংগতিপূর্ণ নথি সংরক্ষণের কারণে, ঠিক কতজন শিশুকে আলাদা করা হয়েছিল, তা নির্ধারণ করা কঠিন। তবে অনুমান করা হয়, প্রতি তিনজন অ্যাবরিজিনাল ও টরে স্ট্রেইট আইল্যান্ডার শিশুর মধ্যে অন্তত একজনকে তাদের পরিবার থেকে আলাদা করা হয়।
যেটা নিশ্চিতভাবে জানা যায়, তা হলো—প্রত্যেকটি অ্যাবরিজিনাল ও টরে স্ট্রেইট আইল্যান্ডার সম্প্রদায় এই ঘটনার গভীর প্রভাব অনুভব করেছে—এবং সেই ক্ষত এখনো রয়ে গেছে।
অনেক স্টোলেন শিশুদের দেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্টেট ও গির্জা পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যেমনটি জানিয়েছেন মিজ ডডসন।
এক পরিবারের ভাই-বোনদের প্রায়ই একে অপরের কাছ থেকে আলাদা করে দেওয়া হতো, এবং কিছু প্রতিষ্ঠান কেবল একেবারে শিশুদের জন্যই নির্ধারিত ছিল।
শিশুদের উপর এই অপূরণীয় ক্ষতির প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল তাদের পরিবার ও সম্প্রদায় পর্যন্ত।

আন্টি লরেইন পিটার্স একজন গামিলারোই এবং ওয়ালিওয়ান নারী, যাকে ১৯৪৩ সালে, মাত্র চার বছর বয়সে, নিউ সাউথ ওয়েলসের কুটামুন্দ্রা ডোমেস্টিক ট্রেনিং হোম ফর অ্যাবরিজিনাল গার্লস-এ শত শত মেয়ের সঙ্গে জোরপূর্বক পাঠানো হয়েছিল। তাঁর দুই ভাইকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কুখ্যাত কিনচেলা অ্যাবরিজিনাল বয়েজ ট্রেনিং হোম-এ।
আন্টি লরেইন বলেন, যখন তিনি সেখানে পৌঁছান, তখন তার পরিচয় কেড়ে নেওয়া হয়। তিনি বলেন,
সেখানে মেয়েদের দেওয়া হতো একটি বিছানা, একটি কাজ এবং একটি ধর্ম।
পরবর্তী দশ বছর আন্টি লরেইনকে শ্বেতাঙ্গ পরিবারগুলোর গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
আজ তিনি স্টোলেন জেনারেশনসের বেঁচে থাকা সদস্যদের একজন প্রতিনিধি এবং 'মারুমালি প্রোগ্রাম'-এর প্রতিষ্ঠাতা—এটি একটি নিরাময়মূলক উদ্যোগ, যা জোরপূর্বক অপসারণের অভিজ্ঞতা থাকা ব্যক্তিদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রস্তুত করা হয়েছে।
এই ধরনের সহায়তা ছাড়া, এধরনের ট্রমা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।
আন্টি লরেইনের কথায়, এখনো এমন অনেক তরুণ-তরুণী আছেন, যারা জানেন না তারা কারা, কোথা থেকে এসেছেন, অথবা কেন তারা এমন আচরণ করছেন।
পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়ার কারনে, ট্রমা অনেক সময় অজান্তেই সন্তানের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে— বিশেষত যখন তারা তাদের বাবা-মা ও দাদা-দাদির ভোগান্তি দেখে বড় হয়েছে।
এটি 'প্রজন্মান্তরের ট্রমা' বা Intergenerational trauma নামে পরিচিত, বলেন শ্যানন ডডসন।
প্রজন্মান্তরের ট্রমার লক্ষণ স্পষ্টভাবে দেখা যায়—উচ্চ হারে পারিবারিক ভাঙন, সহিংসতা, কারাবরণ, আত্মহত্যা এবং মাদক ও অ্যালকোহলের অপব্যবহারের মধ্যে।
বর্তমানে বিভিন্ন সম্প্রদায় এই ট্রমার চক্র ভাঙতে নিরাময়ের পথ বেছে নিচ্ছেন।

হিলিং বা নিরাময় মানে হলো পারিবারিক কাঠামো ও দৃঢ় সম্প্রদায় পুনর্গঠন করা। এর মানে আরও হলো নিজের পরিচয় ও গৌরববোধ পুনরুদ্ধার করা।
বেঁচে থাকা অনেকেই তাঁদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করার এবং অতীতের অন্যায় সম্পর্কে স্বাধীনভাবে কথা বলার প্রয়োজনীয়তা প্রকাশ করেন।
২০১৩ সালে 'কুটা গার্লস অ্যাবরিজিনাল কর্পোরেশন' প্রতিষ্ঠিত হয় কুটা গার্লস হোম-এর সাবেক বাসিন্দাদের দ্বারা—উদ্দেশ্য ছিল স্টোলেন জেনারেশনসের বেঁচে থাকা সদস্য ও তাদের পরিবারের জটিল নিরাময়ের চাহিদা পূরণ করা।
আন্টি লরেইন সেই হোমের অন্য বেঁচে থাকা সদস্যদের সঙ্গে কাজ করেন। তিনি বলেন,
যদি আমরা সম্মিলিতভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে থাকি, তবে আমাদের নিরাময়ও হবে সম্মিলিতভাবেই।
আর কুটার নারীরা একত্রিত হতে খুব ভালোবাসেন।
নিরাময়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিক্ষা—যাতে করে সব অস্ট্রেলীয় নাগরিক বুঝতে পারেন অতীতে কী ধরনের অন্যায় ঘটেছিল, বলেন আন্টি লরেইন।
Intergenerational Trauma Animation, The Healing Foundation
This video contains the voice of a deceased person.
২০০৮ সালে, এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেভিন রাড বহু প্রতীক্ষিত ক্ষমা প্রার্থনা জানান স্টোলেন জেনারেশনস, তাদের বংশধর এবং পরিবারের প্রতি, যা অ্যাপোলজি টু দ্য স্টোলেন জেনারেশনস নামে পরিচিত।
এর পরবর্তীতে বিভিন্ন উদ্যোগ ও উন্নয়ন ঘটেছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো হিলিং ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠা।
সিইও শ্যানন ডডসন আবারও বলেন, “আমাদের সংগঠন একটি জাতীয় নিরাময় প্যাকেজের জন্য জোরালো প্রচার চালাচ্ছে, যেন স্টোলেন জেনারেশনসের বেঁচে থাকা সদস্যদের জন্য যে ন্যায়বিচার এখনো বাকি, তা যেন তাদের মৃত্যুর আগেই বাস্তবায়িত হয়।”

হিলিং ফাউন্ডেশন ট্রমা-সচেতন প্রবীণদের যত্ন (aged care) এবং স্টোলেন জেনারেশনসের সহায়তা সেবার জন্য সমর্থনের আহ্বান জানায়—যাতে প্রজন্মান্তরের নিরাময় প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।
সত্যিকার নিরাময়ের জন্য প্রয়োজন অস্ট্রেলিয়ার সমগ্র জাতির অংশগ্রহণ—তারা যেন সবার কথা শোনে এবং বেঁচে থাকা মানুষদের নিজেদের গল্প পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে।
অস্ট্রেলিয়ায় আপনার নতুন জীবনে স্থায়ী হওয়ার বিষয়ে আরও মূল্যবান তথ্য এবং টিপসের জন্য ‘অস্ট্রেলিয়া সম্পর্কে জানুন’ পডকাস্ট অনুসরণ করুন।
আপনার কোনো প্রশ্ন বা নতুন কোনো বিষয় নিয়ে আমাদের পডকাস্টে শুনতে চাইলে australiaexplained@sbs.com.au -এ আমাদের ইমেল করুন।


![[JPG]_How-Australia-Works_Ep1.jpg](https://assets.sbs.com.au/dims4/default/d1d4da1/2147483647/strip/true/crop/3200x1800+0+0/resize/1280x720!/quality/90/?url=https%3A%2F%2Fsbs-au-brightspot.s3.ap-southeast-2.amazonaws.com%2Fe9%2F46%2F56cf4ff54074a36476e0bcb73e13%2Fjpg-how-australia-works-ep1.jpg&imwidth=1280)
![[JPG]_How-Australia-Works_Ep0.jpg](https://assets.sbs.com.au/dims4/default/9a0f61e/2147483647/strip/true/crop/3200x1800+0+0/resize/1280x720!/quality/90/?url=https%3A%2F%2Fsbs-au-brightspot.s3.ap-southeast-2.amazonaws.com%2F8f%2F15%2F83a000db458f9fc153fde8cde907%2Fjpg-how-australia-works-ep0.jpg&imwidth=1280)

