আপনি কি কখনও অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় পতাকার পাশে লাল, কালো ও হলুদ রঙের একটি পতাকা উড়তে দেখেছেন? এটি হলো অ্যাবরিজিনাল পতাকা। এটি অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী অ্যাবরিজিনাল জনগোষ্ঠী এবং তাদের ভূমি, সম্প্রদায় ও গল্পের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের প্রতীক।
গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো
- অ্যাবরিজিনাল পতাকা অস্ট্রেলিয়ার তিনটি সরকারি জাতীয় পতাকার একটি।
- অ্যাবরিজিনাল পতাকাটি ১৯৭১ সালে ভূমির অধিকার আন্দোলনের প্রতিবাদী পতাকা হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল এবং ১৯৯৫ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অস্ট্রেলিয়ার পতাকা’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
- পতাকার কালো, লাল ও হলুদ রঙ অ্যাবরিজিনাল জনগণ, তাদের ভূমি (কান্ট্রি) এবং সূর্যকে প্রতীকীভাবে উপস্থাপন করে।
- এই পতাকাটি প্রতিবাদের প্রতীক থেকে গর্ব, স্বাগত ও অন্তর্ভুক্তির দৈনন্দিন প্রতীকে পরিণত হয়েছে এবং “ফ্রি দ্য ফ্ল্যাগ” প্রচারণার পর এখন এটি সবাই স্বাধীনভাবে ব্যবহার করতে পারে।
অনেক মানুষের কাছে অ্যাবরিজিনাল পতাকা শুধু একটি পতাকা নয়।
'অস্ট্রেলিয়া এক্সপ্লেইনড' পর্বে আমরা বোঝার চেষ্টা করব কীভাবে এটি শক্তি, টিকে থাকা এবং পরিচয়ের প্রতীক ও স্মারক।
যদিও অস্ট্রেলিয়ার একটি নির্ধারিত জাতীয় পতাকা রয়েছে, দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে তিনটি পতাকাকে স্বীকৃতি দেয়; অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় পতাকা, অ্যাবরিজিনাল পতাকা এবং টরেস স্ট্রেইট আইল্যান্ডার পতাকা।
তবে সবসময় অ্যাবরিজিনাল পতাকা ছিল না।

অ্যাবরিজিনাল পতাকার উৎপত্তি কীভাবে ?
১৯৭১ সালে এই পতাকাটি নকশা করেন লুরিতজা ও ওম্বাই শিল্পী এবং অধিকারকর্মী আঙ্কেল হ্যারল্ড থমাস। তিনি ছিলেন সাউথ অস্ট্রেলিয়ান স্কুল অব আর্টের প্রথম অ্যাবরিজিনাল স্নাতক।
১৯৭১ সালের ১২ জুলাই অ্যাডিলেডে ভূমি অধিকারের দাবিতে আয়োজিত এক বিক্ষোভে প্রথমবারের মতো এই পতাকা উত্তোলন করা হয়। তখন দিনটিকে বলা হতো “ন্যাশনাল অ্যাবরিজিনিস ডে”; যে শব্দটি বর্তমানে পুরোনো হিসেবে বিবেচিত।
এক বছর পর, ক্যানবেরায় অ্যাবরিজিনাল টেন্ট এম্বাসিতে এই পতাকা ভূমির অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠে।
১৯৯৫ সালে অস্ট্রেলিয়ান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এটিকে “ফ্ল্যাগ অব অস্ট্রেলিয়া” হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
অ্যাবরিজিনাল পতাকার অর্থ কী ?
পতাকার নকশা সহজ হলেও গভীর অর্থবহ - কালো রঙ অ্যাবরিজিনাল জনগণকে, লাল রঙ ভূমি ও মাটির সঙ্গে সম্পর্ককে এবং মাঝের হলুদ বৃত্ত সূর্যকে বোঝায়, যা জীবনের কেন্দ্র।
গোমেরয় নারী ও উদীয়মান শিল্পী জেড ব্রেনান বলেন, তিনি এই পতাকায় তার পরিচয়কে দেখেন।
যখন আমি এই পতাকাটি দেখি, তখন আমি আমার দেশকে দেখি, আমার মানুষদের দেখি এবং সূর্যকে দেখি, যা সৃষ্টির প্রতীক। আপনি জানেন, সূর্যই মানুষ ও আমাদের ভূমিকে একত্রিত করে।জেড ব্রেনান
অ্যাবরিজিনাল পতাকা কীভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে ?
সময়ের সঙ্গে কীভাবে পরিবর্তন আসে, তা বোঝাতে কথা বলেছেন ওনারুয়া নারী আন্টি সুসান কেনডাল। তিনি ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে নিউ সাউথ ওয়েলসের আঞ্চলিক শহর কনডোবোলিনে বেড়ে উঠেছেন।
তিনি এমন এক সময়ের কথা মনে করেন, যখন অ্যাবরিজিনাল পতাকা খুব বেশি দেখা যেত না। তার প্রথম স্মৃতিতে এই পতাকা কোনো স্কুলে বা কাউন্সিল অফিসে নয়, বরং টেলিভিশনে দেখা গিয়েছিল।

পরে আন্টি সুসান যখন শিক্ষক হন, তখনও স্কুলজীবনের স্বাভাবিক অংশ হয়ে ওঠেনি এই পতাকা।
তার প্রজন্মের মানুষের কাছে এই পতাকা ছিল এমন কিছু, যা হয়তো প্রতিবাদ সমাবেশে বা টিভিতে দেখা যেত। এটি তখনও দৈনন্দিন অস্ট্রেলিয়ার অংশ হয়ে ওঠেনি।
জেড বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি শুনতেন, “এটাই তোমার মানুষদের পতাকা।”
তরুণ অ্যাবরিজিনালদের জন্য অভিজ্ঞতাটা একেবারেই ভিন্ন। তারা বড় হয়েছে চারপাশে এই পতাকা দেখতে দেখতে।
সিডনির পূর্বাঞ্চলীয় মাতরাভিলে জেডের শৈশব কেটেছে। একটি দেয়ালচিত্র তার এখনও স্পষ্ট মনে আছে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি আরও সাধারণ ও দৈনন্দিন জীবনে এই পতাকার উপস্থিতি দেখতে পান।
তার কাছে এই পতাকা অন্য আদিবাসী মানুষ ও সহযোগীদের চিনে নেওয়ার একটি উপায়। ভিড়ের মধ্যেও এটি তাকে বুঝতে সাহায্য করে, কে তার পাশে আছে।

১৯৯৫ সালে যখন অ্যাবরিজিনাল পতাকা আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ট্রেলিয়ার একটি পতাকা হিসেবে স্বীকৃতি পায়, তখন আন্টি সুসান প্রথমে ছোট ছোট পরিবর্তন লক্ষ্য করেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিরল থেকে এটি স্বাভাবিক দৃশ্যে পরিণত হয়।
জেডের মতে, কোনো ভবনের প্রবেশপথে এই পতাকা দেখলে জায়গাটিকে আলাদা অনুভব হয়।
আপনি গাড়িগুলোতে ছোট ছোট অ্যাবরিজিনাল পতাকার স্টিকার দেখতে পাবেন। এটা আমার খুব ভালো লাগে।আন্টি সুসান কেনডাল
দুই নারীর কাছেই স্কুলের বাইরে, সেতুতে, সমাবেশে, পোশাকে বা ট্যাটুতে এই পতাকার উপস্থিতি গর্ব ও সংযোগের শক্তিশালী উৎস হয়ে উঠেছে।

অ্যাবরিজিনাল পতাকার মালিক কে ?
এই অ্যাবরিজিনাল পতাকার গল্পের আরেকটি দিকও রয়েছে। বহু বছর ধরে অ্যাবরিজিনাল পতাকাটি কে ব্যবহার করতে পারবে, তা নিয়ে আইনি ও সাংস্কৃতিক বিতর্ক ছিল।
পতাকার ডিজাইনার হিসেবে আঙ্কেল হ্যারল্ড থমাস এর কপিরাইটের মালিক ছিলেন। তিনি এর ব্যবহার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে লাইসেন্স দেন, যার মধ্যে একটি বেসরকারি কোম্পানি পোশাক ও পণ্যে পতাকাটির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করত।
ফলে কিছু অ্যাবরিজিনাল সংগঠন ও সম্প্রদায় আইনি নোটিশ পায় এবং অনুমতি বা ফি ছাড়া তারা টি-শার্ট বা পণ্যে এই পতাকা ব্যবহার করতে পারবে না বলে জানানো হয়।
এর প্রতিক্রিয়ায় অ্যাবরিজিনাল-নেতৃত্বাধীন ফ্যাশন ব্র্যান্ড “ক্লোদিং দ্য গ্যাপস” এবং তাদের সহযোগীরা “ফ্রি দ্য ফ্ল্যাগ” প্রচারণা শুরু করে। তারা দাবি তোলে, অন্য জাতীয় পতাকার মতো এই পতাকাও যেন সবার ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত হয়, কোনো ব্যক্তিগত লোগো হিসেবে নয়।
বছরের পর বছর জনচাপ ও আন্দোলনের পর ২০২২ সালে কমনওয়েলথ সরকার ঘোষণা দেয় যে তারা আঙ্কেল হ্যারল্ড থমাসের কাছ থেকে অ্যাবরিজিনাল পতাকার কপিরাইট অধিগ্রহণ করেছে।

এখন অ্যাবরিজিনাল পতাকা অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় পতাকার মতোই সবার ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত। মানুষ এখন কোনো লাইসেন্স ফি বা আইনি জটিলতার ভয় ছাড়াই এটি পোশাক, শিল্পকর্ম ও বিভিন্ন পণ্যে ব্যবহার করতে পারে।
অনেকের কাছে মনে হয়েছে, অবশেষে পতাকাটি সেই জনগণের কাছেই ফিরে এসেছে, যাদের এটি প্রতিনিধিত্ব করে।
পেছনে ফিরে তাকিয়ে আন্টি সুসান বলেন, এই পতাকা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে সাহায্য করেছে। তবে তার বিশ্বাস, এখনও অনেক কাজ বাকি।
এখন যখন আপনি অ্যাবরিজিনাল পতাকা দেখবেন, তখন এর অর্থ ও ইতিহাস সম্পর্কে জানবেন। আর এটি বোঝা মানে অস্ট্রেলিয়াকে আরও গভীরভাবে বোঝার একটি ধাপ এগিয়ে যাওয়া।
অস্ট্রেলিয়ায় নতুন জীবনে মানিয়ে নেওয়ার জন্য আরও মূল্যবান তথ্য ও পরামর্শ পেতে অস্ট্রেলিয়া এক্সপ্লেইন্ড (Australia Explained) পডকাস্টটি সাবস্ক্রাইব করুন বা অনুসরণ করুন।
আপনার কি কোনো প্রশ্ন বা বিষয়ের ধারণা আছে?
ইমেইল করুনঃ australiaexplained@sbs.com.au
সম্পূর্ণ প্রতিবেদনটি পড়তে উপরের অডিও প্লেয়ারে ক্লিক করুন।
Follow SBS Bangla on FACEBOOK.
এই লিঙ্কে ক্লিক করে নতুন এসবিএস রেডিও অ্যাপ ডাউনলোড করুন
এসবিএস বাংলার আরও পডকাস্ট শুনতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট।
আপনি কি জানেন, এসবিএস বাংলা অনুষ্ঠান এখন ইউটিউব এবং এসবিএস অন ডিমান্ডে পাওয়া যাচ্ছে?
এসবিএস বাংলা এখন অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত দক্ষিণ এশীয় সকল জনগোষ্ঠীর জন্য এসবিএস সাউথ এশিয়ান চ্যানেলের অংশ।
এসবিএস বাংলা লাইভ শুনুন প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টায় এসবিএস সাউথ এশিয়ান-এ, ডিজিটাল রেডিওতে, কিংবা, আপনার টেলিভিশনের ৩০৫ নম্বর চ্যানেলে। এছাড়া, এসবিএস অডিও অ্যাপ-এ কিংবা আমাদের ওয়েবসাইটে। ভিজিট করুন www.sbs.com.au/bangla.
আর, এসবিএস বাংলার পডকাস্ট এবং ভিডিওগুলো ইউটিউবেও পাবেন। ইউটিউবে সাবসক্রাইব করুন এসবিএস সাউথ এশিয়ান চ্যানেল। উপভোগ করুন দক্ষিণ এশীয় ১০টি ভাষায় নানা অনুষ্ঠান। আরও রয়েছে ইংরেজি ভাষায় এসবিএস স্পাইস।
Read more about SBS’s use of AI





